চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরের কুতুবদিয়া এলাকায় নোঙর ফেলেছে ‘এমটি নিনেমিয়া’। আজ বুধবার (৬ মে) দুপুরে সৌদি আরব থেকে ১ লাখ ৩৯৫ টন অপরিশোধিত (ক্রুড) তেল নিয়ে এসেছে জাহাজটি।
কাস্টমস ও সার্ভেয়ার কোম্পানির আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীকাল ৭ মে (বৃহস্পতিবার) ইস্টার্ন রিফাইনারির বন্ধ থাকা প্ল্যান্ট পুনরায় চালু করার সম্ভাবনা রয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারির (ইআরএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত জানান, আমদানি করা ১ লাখ ৩৯৫ টন অপরিশোধিত (ক্রুড) তেল পরিশোধন করা হবে রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ক্রুড অয়েলের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় গত ১২ এপ্রিল রাতে ইস্টার্ন রিফাইনারির ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছিল। তবে আশার কথা হচ্ছে, কাঁচামাল বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) এর অভাবে দীর্ঘ ২২ দিন বন্ধ থাকার পর অবশেষে পুনরায় সচল হতে যাচ্ছে দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি।
বাংলাদেশ পেট্টোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এর আমদানি করা ক্রুড অয়েল পরিবহনের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক আজ (বুধবার) দুপুরে জাহাজটি নোঙর করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, নিরাপদে ‘এমটি নিনেমিয়া’ দেশে পৌঁছেছে। কুতুবদিয়া এলাকায় ট্যাংকারটি নোঙর করা হয়েছে। ২৪৯ দশমিক ৯৫ মিটার লম্বা বিশাল জাহাজটি কর্ণফুলী নদী হয়ে বন্দরের ডলফিন জেটিতে আসতে না পারায় নিয়ম অনুযায়ী ছোট ট্যাংকার জাহাজে খালাস করে (লাইটারিং) নিয়ে আসা হবে।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়া হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে তেল আমদানির ক্ষেত্রে বিশেষ কৌশল নিয়েছে বিপিসি। লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী সৌদি আরবের ‘ইয়ানবু বন্দর’ থেকে এই তেল সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ভাড়া করা জাহাজটি গত ২০ এপ্রিল ইয়ানবু থেকে যাত্রা শুরু করে সফলভাবে দেশে এসে পৌঁছায়।
বিপিসি সুত্র জানায়, বর্তমানের এই চালানে শোধনাগারটি প্রায় ২৫ দিন চলতে পারবে। তবে জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে মে মাসের ১০ তারিখে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ফুজাইরাহ বন্দর’ থেকে আরও ১ লাখ মেট্রিক টন তেলের পরবর্তী চালান লোড হওয়ার কথা রয়েছে। ফুজাইরা থেকে ক্রুড নেওয়ার জন্য ‘এমটি ফসিল’ নামের আরেকটি জাহাজ ফুজাইরার পথে রয়েছে। এটিও ১১ মে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসার কথা রয়েছে। এবং আগামী ২৫ মে দেশে পৌঁছাবে বলে বিপিসি নিশ্চিত করেছে।
ফলে আগামীতে তেলের কোনো ঘাটতি থাকবে না বলে আশাবাদ ব্যাক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মালিকানাধীন একমাত্র পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি ইআরএল। এতে পরিশোধনে ব্যবহৃত শতভাগ ক্রুড অয়েল আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ জি টু জি পদ্ধতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসব ক্রুড আমদানি করে। আমদানি করা ক্রুডের শতভাগ পরিবহন করে সরকারি পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিএসসি। এসব ক্রুড পরিবহনের জন্য বর্তমানে আমেরিকান প্রতিষ্ঠান ‘নর্ডিক এনার্জি’ থেকে চার্টারে জাহাজ ভাড়া নেয় বিএসসি।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিএসসি’র চার্টারার প্রতিষ্ঠান আমেরিকান কোম্পানি হওয়ায় মার্চ মাসে ২ লাখ টন ক্রুড পরিবহনে ঝুঁকি তৈরি হয়। এরমধ্যে সৌদি আরবের রাস তানুরা থেকে ১ লাখ টন ক্রুড লোড করে হরমুজ প্রণালিতে হামলার আশঙ্কায় গত ৫ এপ্রিল থেকে আটকা পড়ে ‘নর্ডিক পোলাক্স’ নামের ট্যাংকার জাহাজ। ২ মাস পেরিয়ে গেলেও কখন জাহাজটি বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে তার নিশ্চয়তা এখনো মেলেনি।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করে, যা দেশের বার্ষিক ৭২ লাখ টন চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করে।
দেশের চাহিদা মেটাতে ৯২ শতাংশ জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। বাকি ৮ শতাংশ স্থানীয় উৎস ও কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পাওয়া যায়। জ্বালানি চাহিদার তালিকায় ডিজেল শীর্ষে রয়েছে। এরপর রয়েছে ফার্নেস অয়েল, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন এবং প্লেন চলাচলে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল।
২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বিপিসি ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪১ টন জ্বালানি বিক্রি করেছে। ইআরএল ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত বলেন, দুই লাইটারে ক্রুড অয়েল ডলফিন জেটিতে আনার পর ইআরএলের ট্যাংকে খালাস করা হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিশোধন কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। একটি জাহাজের তেল খালাস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চার ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। সব মিলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিকেল নাগাদ ইস্টার্ন রিফাইনারির ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন ইউনিট চালু হবে বলে আশা করেন প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত।

