আমাদের দেশের অর্থনীতি মূলত দুটি বিষয়ের ওপর টিকে আছে—বিদেশে পোশাক বিক্রি করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা কর্মীদের পাঠানো টাকা (রেমিট্যান্স)। তাই মধ্যপ্রাচ্যে কোনো যুদ্ধ বা গোলমাল হলে আমাদের দেশেও বড় ধরনের বিপদ নেমে আসতে পারে। এটি শুধু বিদেশের খবর নয়, আমাদের খাবার, বিদ্যুৎ ও টাকার নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত।
আমাদের মূল সমস্যাগুলো কোথায়?
একটি জায়গার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা:
আমাদের দেশের বাইরে থাকা ১০০ জন শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ৬৫ জনই মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন। সেখানে কোনো বড় যুদ্ধ বাঁধলে লাখ লাখ মানুষ কাজ হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হবেন। এতে দেশে হঠাৎ বেকার মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে।
ডলারের টানাপোড়েন:
বিদেশ থেকে তেল, গ্যাস, কয়লা, সার, গম ও ভোজ্যতেল কেনার জন্য বিদেশি টাকা (ডলার) লাগে। প্রবাসীদের পাঠানো আয় কমে গেলে ব্যাংকে ডলারের জমানো টাকা ফুরিয়ে যাবে। তখন দরকারি জিনিস কেনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
উন্নত জিনিস তৈরি না করা:
ভিয়েতনাম ও আমাদের অর্থনীতির আকার কাছাকাছি হলেও তারা কম্পিউটার, মাইক্রোচিপ ও আধুনিক কৃষিপণ্য বিক্রি করে বছরে প্রায় ৪৭৩ বিলিয়ন ডলার আয় করে। সেখানে আমরা শুধু পোশাক বিক্রি করে মাত্র ৪৮ বিলিয়ন ডলারে আটকে আছি।
এখনই যে জরুরি কাজগুলো করতে হবে:
খাবারের জোগান ঠিক রাখা:
কোনো জমি যেন অনাবাদি বা খালি পড়ে না থাকে, সব জায়গায় চাষ করতে হবে। বিপদের সময়ের জন্য খাদ্য মজুত দ্বিগুণ করতে হবে এবং সার তৈরির কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ রাখতে হবে।
বিদ্যুৎ ও তেল-গ্যাস বাঁচানো:
অকারণে বিদ্যুৎ অপচয় বন্ধ করতে হবে। বসে থাকা অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বাড়তি খরচের চুক্তি বাতিল বা ঠিক করতে হবে এবং দ্রুত বাড়ি ও কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসাতে হবে।
সঠিক পথে টাকা আনা:
অবৈধভাবে বা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো বন্ধ করতে হবে। প্রবাসীরা যাতে নিরাপদে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠান, সেজন্য সরকারের ঘোষিত বোনাস যেন তারা দ্রুত পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ভবিষ্যতের বড় পরিকল্পনা:
দক্ষতা বাড়ানো:
সাধারণ কায়িক শ্রমের বদলে নার্সিং, কম্পিউটার কোডিং, ভারী যন্ত্রপাতি চালানো ও ওয়েল্ডিংয়ের মতো আধুনিক কাজ শেখাতে হবে। দক্ষ মানুষ বিদেশে গেলে কর্মী কম হলেও আয় অনেক বেশি হবে।
নতুন দেশের খোঁজ করা:
শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ভরসা না করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে সরকারি চুক্তির মাধ্যমে কর্মী পাঠাতে হবে।
নানা রকম পণ্য তৈরি:
শুধু পোশাকের ওপর নির্ভর না করে ওষুধ, চামড়ার জিনিসপত্র, হালকা যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যার বিদেশে বিক্রি করতে হবে। বিদেশি বড় কোম্পানিগুলো যাতে এ দেশে কারখানা বানায়, সেজন্য বন্দর ও সরকারি নিয়মকানুন সহজ করতে হবে।
বিদেশের ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধ থামানো আমাদের হাতে নেই। কিন্তু নিজেদের ঘর শক্ত করে তৈরি করার সুযোগ আমাদের আছে। শুধু সস্তা শ্রম না বেচে নিজেদের তৈরি পণ্য ও প্রযুক্তির কারখানা গড়ে তুললেই দেশ সুরক্ষিত থাকবে।

