সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার প্রতিষ্ঠান আরামিট সিমেন্ট পিএলসির বিরুদ্ধে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক থেকে ১৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাত ও অর্থ পাচারের অভিযোগে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মামলাগুলোতে মোট ২৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার দুদকের নিয়মিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, আরামিট সিমেন্ট পিএলসি সিমেন্টের কাঁচামাল কেনার নামে কোনো প্রকৃত ক্রয়-বিক্রয় না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার দাখিল করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, জুবলী রোড শাখা থেকে অর্থ গ্রহণ করে। এর মধ্যে ২৭টি ডিলের মাধ্যমে ১৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা উত্তোলন করে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
দুদক জানায়, প্রথম ঘটনায় ২০১৮ সালের ২০ মার্চ আরামিট সিমেন্ট পিএলসির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, আগ্রাবাদ শাখার গ্রাহক ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে একটি ডিলের মাধ্যমে ৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাত করা হয়। এ ঘটনায় ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ঘটনায় ২০১৮ সালের ৪ এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি, কামাল বাজার শাখার গ্রাহক ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে ১৭টি ডিলের মাধ্যমে ৪১ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ঘটনায় ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তৃতীয় ঘটনায় ২০২০ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২১ সালের ২৮ মার্চ পর্যন্ত সময়ে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি, সদরঘাট শাখার গ্রাহক ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে নয়টি ডিলের মাধ্যমে গ্রাহকের ইকুইটি ৪ কোটি ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বাদ দিয়ে ৪২ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, আরামিট গ্রুপের মালিক ও তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী হিসেবে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ অনুমোদনে ভূমিকা রাখেন। পরে আরামিট গ্রুপের কর্মচারীকে মালিক সাজিয়ে ভুয়া সরবরাহকারী দেখিয়ে ডিল অনুমোদন করানো হয়। অনুমোদিত ঋণের অর্থ বিভিন্নভাবে হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের পর নগদে উত্তোলন, পূর্বের দায় পরিশোধ এবং ইউএইতে পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
দুদকের নথিতে আরও বলা হয়েছে, পাচার করা অর্থ দিয়ে ইউএইতে সম্পদ কেনা হয় এবং পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করা হয়েছে। অভিযোগে সাইফুজ্জামান চৌধুরীকে অর্থ আত্মসাতের ‘আলটিমেট বেনিফিশিয়ারি’ ও অন্যতম হোতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রুকমীলা জামানকে আরামিট সিমেন্ট পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ইউসিবি পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ অনুমোদন এবং ভুয়া সরবরাহকারীর মাধ্যমে ডিল অনুমোদন করিয়ে অর্থ আত্মসাত ও পাচারে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।
আরামিট সিমেন্টের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার মোহাম্মদ শাহ আলমের বিরুদ্ধে মালামাল সরবরাহ না হলেও ভুয়া ও মিথ্যা আবেদন করে ডিল অনুমোদন করানো এবং পরবর্তী সময়ে অর্থ হস্তান্তর, স্থানান্তর, রূপান্তর, নগদ উত্তোলন, পূর্বের দায় পরিশোধ ও ইউএইতে পাচারে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আরামিট সিমেন্টের এজিএম মো. আব্দুল আজীজের বিরুদ্ধে ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের মালিক সেজে ভুয়া সরবরাহকারী হিসেবে আবেদন করা এবং ডিল অনুমোদন করানোর অভিযোগ রয়েছে। দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, তিনি আরামিট গ্রুপের এজিএম এবং সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পিএস হিসেবেও কাজ করতেন। তার বিরুদ্ধে ব্যাংক হিসাব খোলা, ভুয়া পরিদর্শন প্রতিবেদন দাখিল এবং অর্থ পাচারে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।
আরামিট সিমেন্টের এজিএম একেএম মারুফের বিরুদ্ধেও মালামাল সরবরাহ না হলেও ভুয়া ও মিথ্যা আবেদন করে ডিল অনুমোদন করানোর অভিযোগ রয়েছে।
মামলাগুলোতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির জুবলী রোড শাখার একাধিক কর্মকর্তাকেও আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন মো. জাকির হোসেন, মোহাম্মদ আব্দুল হক, মুহাম্মদ তানভীর হাসান, মো. আবদুল কাদের, মো. মিজানুর রহমান ভূঁইয়া, মুহাম্মদ আবদুল করিম, মোহাম্মদ আখতার হোসেন, মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন, মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন, মো. আশরাফ উদ্দীন, মোহাম্মদ রাশেদ সাদাত, আকতারুল আজীম, মো. মহিউদ্দীন, মোহাম্মদ খোরশেদ আলম, মো. শহিদুল্লাহ, মোহাম্মদ হারুন আল রশিদ, মোহাম্মদ মহসীন আলী, আবুল কালাম আজাদ ও শেখ মনিরুজ্জামান।
এ ছাড়া ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি, কামাল বাজার শাখার মো. রুবেল উদ্দিন, কে এ এ এম ইয়াসির হেলালী ও ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, আগ্রাবাদ শাখার মো. এমদাদুল হাসান ও খোরশেদ আলমকে আসামি করা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা ডিলের বিপরীতে কোনো মালামাল সরবরাহ না হলেও অফিস নোট, পে-অর্ডার ইস্যু ইন্সট্রাকশনসহ বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর করে পরস্পর যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতা করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের মালিক মো. আব্দুল আজীজ আরামিট গ্রুপের এজিএম ও সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পিএস হওয়া সত্ত্বেও তাকে সরবরাহকারী দেখিয়ে পরিদর্শন প্রতিবেদন দাখিল এবং ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। পরে অর্থের প্রকৃত গন্তব্য অনুসন্ধান না করে অর্থ হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে নগদে উত্তোলন, পূর্বের দায় পরিশোধ এবং ইউএইতে পাচারে সহযোগিতা করা হয়েছে বলে দুদকের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

