মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের দেনা ও ভবিষ্যৎ করণীয়

​মোহাম্মদ ইমরান চৌধুরী
- Advertisement -
Single page 1st Paragraph

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ খাতের ৫২,৩০০.৮৮ কোটি টাকা (~৫২৩ বিলিয়ন টাকা) অনাদায়ী বা বকেয়া বিল একটি গুরুতর তারল্য সংকট (liquidity crisis) এবং কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা নির্দেশ করে। এই ঋণের বোঝা কেবল সাময়িক নগদ অর্থের সংকট নয়; এটি মূলত নীতিগত সমস্যা, আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং চুক্তিভিত্তিক নানা জটিলতার চরম পরিণতি।

​মূল পর্যবেক্ষণ ও কাঠামোগত বিশ্লেষণ

​১. ক্যাপাসিটি চার্জ এবং আইপিপি-র (IPP) ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা

​বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের কেন্দ্রসমূহ (মোট ৩২,৮১১ কোটি টাকা): মোট ঋণের ৬০%-এরও বেশি বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র (IPP) এবং যৌথ উদ্যোগের (JV) কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বকেয়া (গ্যাস/জ্বালানি তেলভিত্তিক IPP-এর জন্য ১৭,৩৫৮ কোটি টাকা এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের জন্য ১৫,৪৫৩ কোটি টাকা)।

​”টেক-অর-পে” (Take-or-Pay) ফাঁদ: বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (PPA) মধ্যে বাধ্যতামূলক ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা চার্জের শর্ত থাকায় এই ব্যয় এতটা বেড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদিত হোক বা না হোক, এমনকি বিদ্যুৎ গ্রিডের দুর্বলতা বা জ্বালানি সংকটের কারণে কেন্দ্র বন্ধ থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মালিকদের নির্দিষ্ট ফি দিতে আইনিভাবে বাধ্য থাকে।

​সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বকেয়া (৫,৬২৩ কোটি টাকা): সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর বকেয়া অর্থ প্রকাশ করে যে, বিপিডিবি থেকে সময়মতো অর্থ না পাওয়ায় খোদ সরকারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও মারাত্মক রাজস্ব সংকটে পড়েছে।

​২. আন্তঃসংস্থা চক্রাকার ঋণ (Circular Debt)

​পেট্রোবাংলার পাওনা (১১,৬৩৪ কোটি টাকা): পেট্রোবাংলার কাছে ১১,৬০০ কোটি টাকার বেশি বকেয়া থাকা একটি ক্ষতিকর চক্রাকার ঋণের জন্ম দিচ্ছে। বিপিডিবি গ্যাস বিল পরিশোধে দেরি করলে পেট্রোবাংলা আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর (IOC) পাওনা মেটাতে, এলএনজি (LNG) আমদানি করতে বা দেশীয় গ্যাস কূপ অনুসন্ধানে অর্থায়ন করতে সমস্যার মুখে পড়ে।

​৩. বৈদেশিকের নির্ভরতার ঝুঁকি

​ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি (৩,৮৯২ কোটি টাকা): সীমান্ত পেরিয়ে বিদ্যুৎ আমদানির বকেয়া বিল কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যেহেতু আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্য বৈদেশিক মুদ্রায় মেটাতে হয়, তাই ডলারের সংকট এই দেনা পরিশোধকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

​সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব

​ব্যাংকিং ও ঋণ ব্যবস্থার ওপর চাপ: দীর্ঘদিন অর্থ না পাওয়ায় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকেরা স্থানীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ শোধ করতে পারছে না এবং জ্বালানি আমদানির জন্য নতুন এলসি (LC) খুলতে পারছে না, যা পুরো আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাকে হুমকিতে ফেলছে।

​কার্যক্ষমতার সংকট ও লোডশেডিং: জ্বালানি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণের পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে বিশেষ করে গরমের সময়ে এবং সেচ মৌসুমে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

​রাজস্ব ও ভর্তুকির সংকট: এই দেনা অর্থ খাতকে স্থিতিশীল রাখা এবং আইএমএফ-এর (IMF) শর্ত অনুযায়ী জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর প্রচেষ্টার সাথে সাংঘর্ষিক। বিশেষ বন্ড ইস্যু করে সাময়িক সমাধান দেওয়া হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদী কোনো সমাধান নয়।

​কৌশলগত সুপারিশসমূহ

​১. বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (PPA) পুনর্গঠন: অব্যবহৃত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পেছনে টাকা দেওয়া বন্ধ করতে “বিদ্যুৎ নেই তো টাকা নেই” (No Electricity, No Pay) অথবা চাহিদার ওপর ভিত্তি করে মূল্য পরিশোধের মডেল চালু করা।
২. দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা: ব্যয়বহুল আমদানিকৃত এলএনজি-র ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত স্থল ও সাগরে গ্যাস কূপ খনন কার্যক্রম বাড়ানো।
৩. বকেয়া পরিশোধের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা: বিপিডিবি, পেট্রোবাংলা এবং বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের (IPP) বকেয়া মেটাতে ধাপে ধাপে একটি স্বচ্ছ ও নির্ধারিত সময়ভিত্তিক ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করা।
৪. নবায়নযোগ্য শক্তির বিস্তার: জ্বালানি খরচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমাতে বড় আকারের সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিস্তার ঘটানো।

এই বিভাগের সব খবর

বাংলাদেশ-জাপান শীর্ষ বৈঠক: ৬.৩ বিলিয়ন ডলার বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা

বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো ও আইসিটি খাতে ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন (৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের...

বাংলাদেশ-জাপান শীর্ষ বৈঠক: জ্বালানি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বারোপ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে দু’দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা,...

ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’: দেশের চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

পশ্চিমমধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে একই এলাকায় অবস্থান করছে। ঘূর্ণিঝড়টি আরও পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে...

সর্বশেষ

বাংলাদেশ-জাপান শীর্ষ বৈঠক: ৬.৩ বিলিয়ন ডলার বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা

বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো ও আইসিটি খাতে ১ ট্রিলিয়ন জাপানি...

বাংলাদেশ-জাপান শীর্ষ বৈঠক: জ্বালানি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বারোপ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে...

ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’: দেশের চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

পশ্চিমমধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়...

জাপান-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব হবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চালিকাশক্তি: প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি...

বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশ ও জাপান দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রী...

সাসাকাওয়ার আমন্ত্রণে নৈশভোজে অংশগ্রহণ করলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও সাসাকাওয়া পিস...