১. ২০ সংকটাপন্ন ব্যাংকের চিত্র (খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি)
এই অংশে দেশের শীর্ষ ২০টি সংকটাপন্ন ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ (NPL), খেলাপি ঋণের অনুপাত এবং মূলধন ঘাটতির পরিমাণ (কোটি টাকায়) দেখানো হয়েছে।
* *মোট খেলাপি ঋণ (NPL):* ৫,৫৭,০৩০ কোটি টাকা।
* *গড় খেলাপি ঋণের অনুপাত:* ৩০.৬০%
* *মোট মূলধন ঘাটতি:* ২,৭৮,০২২ কোটি টাকা।
শীর্ষ ৫টি সংকটাপন্ন ব্যাংক:
১. ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক: খেলাপি ঋণ ৮৫,৯৫০ কোটি টাকা (৭০.৮৬%), মূলধন ঘাটতি ৬৪,১৬২ কোটি টাকা।
২. *সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক:* খেলাপি ঋণ ৪৯,১৯০ কোটি টাকা (৬৩.৯৪%), মূলধন ঘাটতি ৩০,০৫৩ কোটি টাকা।
৩. *ইউনিয়ন ব্যাংক:* খেলাপি ঋণ ৪৮,৬২০ কোটি টাকা (৬২.৩৫%), মূলধন ঘাটতি ২৯,৬৫৩ কোটি টাকা।
৪. *এক্সিম ব্যাংক:* খেলাপি ঋণ ৪০,৭৬০ কোটি টাকা (৫৭.৫৫%), মূলধন ঘাটতি ২৫,৯১৪ কোটি টাকা।
৫. *জনতা ব্যাংক:* খেলাপি ঋণ ৩৫,৩৪০ কোটি টাকা (৪৫.৫৫%), মূলধন ঘাটতি ২২,৪৮২ কোটি টাকা।
(এছাড়াও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ সহ ২০টি ব্যাংকের তালিকা রয়েছে।)
২. ব্যাংকিং খাতের সার্বিক খেলাপি ঋণ (NPL) চিত্র
ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যাংকিং খাতের সার্বিক চিত্র নিম্নরূপ:
* *মোট ঋণ বিতরণ:* ১৮,১৯,০০০ কোটি টাকা।
* *মোট খেলাপি ঋণ (NPL):* ৫,৫৭,০৩০ কোটি টাকা।
* *সার্বিক খেলাপি ঋণের অনুপাত:* ৩০.৬০%
* *ব্যাংকিং খাতের CRAR (মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত):* -২.৬৪% (ঋণাত্মক)
খেলাপি ঋণের শ্রেণীবিভাগ:
* *মন্দ বা ক্ষতিজনক ঋণ (Bad/Loss):* ৬৯.৪% (৫,৫৭,০৩০ কোটি টাকা)
* *সাব-স্ট্যান্ডার্ড বা নিম্নমানের ঋণ:* ১৮.৩% (১,৪৬,৬৫০ কোটি টাকা)
* *ডাউটফুল বা সন্দেহজনক ঋণ:* ৭.৬% (৬০,৯৮০ কোটি টাকা)
* *অন্যান্য ক্যাটাগরি:* ৪.৭% (৩৭,৯৭০ কোটি টাকা)
৩. শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপি গ্রুপ বা গ্রাহক
দেশের শীর্ষ ২০টি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ বা গ্রাহকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ *১,৮৭,৯২০ কোটি টাকা*। (এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী খেলাপি ও পুনঃতফসিলকৃত ঋণও অন্তর্ভুক্ত)।
*শীর্ষ ৫টি ঋণ খেলাপি গ্রুপ:*
১. সালমান এফ রহমান গ্রুপ: ২৩,২৩৪ কোটি টাকা।
২. এস. আলম গ্রুপ: ২১,২৫৬ কোটি টাকা।
৩. বেক্সিমকো গ্রুপ:১৯,৫৭০ কোটি টাকা।
৪. নাসা গ্রুপ: ১৫,০১০ কোটি টাকা।
৫. জেমকন গ্রুপ: ১২,৫৩০ কোটি টাকা।
(এছাড়াও তালিকায় আর.এস.আর.এম, সাইফ পাওয়ারটেক, নাবিল গ্রুপ, জেনেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও ওরিয়ন গ্রুপসহ ২০টি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে।)
৪. বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট: টাইমলাইন ও ফলাফল
সংকটের টাইমলাইন (২০১০ – ২০২৪):
* *২০১০-২০১২ (দ্রুত ঋণ প্রবৃদ্ধি): রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী মহলের চাপে ঋণ বিতরণ ব্যাপক বৃদ্ধি পায়।
* *২০১৩-২০১৬ (ঋণ কেন্দ্রীভূতকরণ): দেশের কয়েকটি বড় গ্রুপ ও সুনির্দিষ্ট খাতের হাতে ঋণ কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করে।
* *২০১৭-২০১৯ (পুনঃতফসিলের প্রবণতা):খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে ব্যাপকভাবে ঋণ পুনঃতফসিল (Reschedule) করা হয়।
* *২০২০-২০২২ (NPL ও মুনাফা ক্ষয়):অর্থনৈতিক ধাক্কা, করোনা মহামারী এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়তে থাকে।
* *২০২৩-২০২৪ (সংকট প্রকট):মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও তীব্র তারল্য সংকটে ব্যাংকিং খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
সংকটের ফলাফল ও প্রভাব:
* খেলাপি ঋণ ৩০% অতিক্রম করেছে।
* অধিকাংশ ব্যাংকে তীব্র মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
* CRAR ঋণাত্মক (-২.৬৪%) পর্যায়ে নেমে গেছে।
* আমানতকারীদের আস্থা হ্রাস পেয়েছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সমাধানের রূপরেখা:
* দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন ও একীভূতকরণ (Merger) করা।
* সুশাসন, জবাবদিহিতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা।
* খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত করা।
* পুঁজিবাজার ও তারল্য সহায়তা বৃদ্ধি করা।
* স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল তদারকি জোরদার করা।
৫. সংকটাপন্ন ব্যাংকসমূহের পাওয়ারপয়েন্ট স্টাইল সারাংশ
*মূল বার্তা: ২০টি ব্যাংক চরম সংকটে রয়েছে এবং মোট মূলধন ঘাটতি ২,৭৮,০২২ কোটি টাকা।
* *মূল সমস্যাসমূহ:
রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মিত ঋণ বিতরণ; দুর্বল কর্পোরেট গভর্নেন্স; বারবার ঋণ পুনঃতফসিল করে আসল খেলাপি চিত্র আড়াল করা; এবং শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা।
* *প্রভাব:
ব্যাংকের তারল্য সংকট, ঋণ প্রবৃদ্ধি হ্রাস, বিনিয়োগে মন্দা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হওয়া এবং আমানতকারীদের আস্থা হ্রাস।
* *অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করণীয়:
দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ দ্রুত আদায় ও নিলাম প্রক্রিয়া জোরদার করা, সুশাসন আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি বাড়ানো।
(তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন, ডিসেম্বর ২০২৪)

