রাজধানীবাসীর জীবনধারণের প্রধান উৎস ঢাকা ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি। কিন্তু সেই পানিতেই যদি মিশে থাকে ক্যানসার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত রাসায়নিক, তবে পুরো জাতি এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ঢাকা ওয়াসার পানিতে PFAS (Per- and Polyfluoroalkyl Substances) বা ‘ফরএভার কেমিক্যাল’, বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক এবং ফার্মাসিউটিক্যালস বা ওষুধের অবশিষ্টাংশের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। এই তথ্য জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
গবেষণার প্রেক্ষাপট:শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি রসায়ন বিভাগের ড. আরিফ এবং ড. কাইউম সাহেবের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল সুইডেনের Umea University-এর যৌথ সহযোগিতায় এই পরীক্ষাটি সম্পন্ন করেন। ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন স্থান থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে উন্নত সুইডিশ ল্যাবে পরীক্ষা করা হলে এই ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। গবেষণাপত্রটি প্রকাশের সময় ঢাকা ওয়াসার ল্যাবের চারজন কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন, যা এই তথ্যের সত্যতাকে আরও জোরালো করে।
কী এই PFAS এবং এর ভয়াবহতা?PFAS-কে বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলা হয় ‘ফরএভার কেমিক্যাল’ বা চিরস্থায়ী রাসায়নিক। কারণ এটি প্রকৃতিতে বা মানুষের শরীরে কখনও পুরোপুরি মিশে যায় না বা ভেঙে যায় না।
* ক্যানসারের ঝুঁকি:
এটি সরাসরি কিডনি, লিভার এবং অণ্ডকোষের ক্যানসারের সাথে সম্পৃক্ত।
* শিশুদের ঝুঁকি:
গর্ভবতী নারী এবং শিশুদের জন্য এটি সবথেকে বেশি বিপজ্জনক। এটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
* অন্যান্য রোগ:
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, থাইরয়েডের সমস্যা এবং উচ্চ কোলেস্টেরলের জন্য এই কেমিক্যাল দায়ী।
পানিতে কীটনাশক ও ওষুধের উপস্থিতি:গবেষণায় দেখা গেছে, ওয়াসার পানিতে বিষাক্ত কীটনাশক এবং বিভিন্ন ওষুধের (ফার্মাসিউটিক্যালস) কণা রয়েছে। কৃষি জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক এবং কলকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য যখন নদী বা ভূগর্ভস্থ পানিতে মেশে, তখন যথাযথ ট্রিটমেন্ট ছাড়া তা সরাসরি সরবরাহ লাইনে চলে আসে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ গড়ে প্রতিদিন দুই লিটার পানি পান করলে তার শরীরে কী পরিমাণ বিষ প্রবেশ করছে, তা কল্পনা করাও কঠিন।
দায় কার?
ওয়াসার পানির মান নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। গবেষণার ফলাফল জানার পরেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব ক্ষমার অযোগ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াসার সার্ফেস (নদীর পানি) এবং গ্রাউন্ড ওয়াটার (ভূগর্ভস্থ পানি) আলাদাভাবে পরীক্ষা করে এর রুট কজ (Root Cause) বা মূল উৎস খুঁজে বের করা জরুরি।
অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ওয়াসার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টগুলো কি এই ধরণের আধুনিক রাসায়নিক দূর করতে সক্ষম? সাধারণ পানি ফোটানোর পদ্ধতিতে PFAS বা কীটনাশক দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন Activated Carbon Filtration বা Reverse Osmosis (RO) এর মতো উন্নত প্রযুক্তি।
নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া:বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। সচেতন নাগরিকেরা বলছেন, “আমরা টাকার বিনিময়ে ওয়াসার কাছ থেকে বিষ কিনছি।” যারা নিরাপদ খাদ্য ও পানির আন্দোলনে যুক্ত, তারা দ্রুত এই বিষয়ে ওয়াসার শীর্ষ কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। এটি আর কেবল একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
দ্রুত পদক্ষেপের দাবি:
১. অবিলম্বে ওয়াসার প্রতিটি জোনের পানির মান পুনরায় নিরপেক্ষ ল্যাবে পরীক্ষা করা।
২. সরবরাহকৃত পানির রিস্ক ফ্যাক্টর অ্যানালাইসিস করে জনসম্মুখে প্রকাশ করা।
৩. আধুনিক ফিল্ট্রেশন প্রযুক্তি ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে যুক্ত করা।
৪. শিল্পবর্জ্য ও কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা।
পুরো একটি প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে এখনই ঢাকা ওয়াসার পানিকে এই প্রাণঘাতী রাসায়নিক মুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই।

