চট্টগ্রামের চামড়াশিল্প বর্তমানে চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও জাতীয় সম্পদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক সময়ের সমৃদ্ধ এই শিল্পটি এখন কার্যত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। নিচে এর বর্তমান পরিস্থিতি এবং সংকটের প্রধান কারণগুলো বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান করুণ দশা
বিশাল পতন:
একসময় চট্টগ্রামে ২২টি সচল ট্যানারি ছিল, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া সরবরাহ করত। বর্তমানে হাতে গোনা মাত্র একটি ট্যানারি (রীফ লেদার) কোনোমতে টিকে আছে। বাকিগুলো দীর্ঘদিনের লোকসান, পরিবেশগত জটিলতা এবং আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে।
আর্থিক বিপর্যয়:
চামড়া ব্যবসার সাথে জড়িত প্রায় ২০০-এর বেশি স্থানীয় ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন। ব্যবসায়ীরা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই পেশা ধরে রাখতে গিয়ে নিজেদের জমি ও ব্যক্তিগত সম্পদ পর্যন্ত বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
ঢাকাকেন্দ্রিক নির্ভরশীলতা:
স্থানীয় ট্যানারিগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম এখন কাঁচা চামড়া সংগ্রহের একটি ‘হাব’ বা আড়তদারী কেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে, কিন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণের সব ক্ষমতা এখন ঢাকার সাভার চামড়া শিল্পনগরীর ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
সংকটের মূল কারণ
আন্তর্জাতিক সনদের অভাব (LWG Certification): আন্তর্জাতিক মানের ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (LWG) সনদ না থাকায় ইউরোপ ও আমেরিকার নামী ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে চামড়া কিনতে অনাগ্রহী। ফলে এই শিল্প বিশ্ববাজারের বড় অংশ থেকে ছিটকে পড়েছে।
পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স ও সিইটিপি (CETP):
সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর না হওয়ায় এবং পরিবেশগত মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় রপ্তানি আয় কমে গেছে।
লাম্পি স্কিন ডিজিজ (LSD):
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবাদি পশুর মধ্যে লাম্পি স্কিন রোগের প্রাদুর্ভাব চামড়ার গুণগত মান মারাত্মকভাবে নষ্ট করেছে। আক্রান্ত পশুর চামড়া ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় কাঁচা চামড়ার বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।
সিন্ডিকেট ও ন্যায্যমূল্যের অভাব:
কোরবানির ঈদে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্যমূল্য পান না। অনেক সময় আড়তদাররা ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করে টাকা সময়মতো পান না, যা পুরো সাপ্লাই চেইনে তারল্য সংকট তৈরি করে।
বিনিয়োগ ও ঋণ সংকট:
ব্যাংকগুলো চামড়া শিল্পে ঋণ দিতে অনীহা প্রকাশ করছে, কারণ এ খাতের অধিকাংশ ব্যবসায়ীই ইতিমধ্যে ঋণখেলাপি বা আর্থিক সংকটের মুখে। আধুনিক প্রযুক্তি ও কোল্ড স্টোরেজের অভাবে চামড়া সংরক্ষণেও খরচ অনেক বেড়েছে।
৩. জাতীয় সম্পদের অপচয়
প্রতিবছর কোরবানির মৌসুমে চট্টগ্রামে ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ পিসের বেশি চামড়া সংগৃহীত হয়। কিন্তু সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা এবং ক্রেতার অভাবে অনেক সময় চামড়া অবিক্রীত থেকে যায়। অবিক্রীত চামড়া রাস্তায় বা ডাম্পিং স্টেশনে ফেলে দেওয়া বা মাটিচাপা দেওয়ার ঘটনা প্রতি বছরই খবরের শিরোনাম হয়, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় এক ক্ষতি।
উত্তরণের সম্ভাব্য পথ
বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, এই শিল্পকে বাঁচাতে হলে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. সিইটিপি সংস্কার:
সাভারের বর্জ্য শোধনাগারকে বিশ্বমানের করে তোলা যাতে আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন করা সম্ভব হয়।
২. স্থানীয় কোল্ড স্টোরেজ:
চট্টগ্রামে চামড়া সংরক্ষণের জন্য উন্নত কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা তৈরি করা, যাতে দূরপাল্লার পরিবহনে চামড়া নষ্ট না হয়।
৩. বাজার নিয়ন্ত্রণ:
কাঁচা চামড়া সংগ্রহের ক্ষেত্রে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে সরাসরি ট্যানারি মালিকদের সাথে আড়তদারদের সমন্বয় করা।
৪. রপ্তানি উন্মুক্তকরণ:
কাঁচা চামড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে উন্মুক্ত বাজার নীতি বিবেচনা করা যাতে প্রতিযোগিতামূলক দামে ব্যবসায়ীরা চামড়া বিক্রি করতে পারেন।
চট্টগ্রামের চামড়াশিল্প তার অতীত গৌরব ফিরে পাবে কি না, তা নির্ভর করছে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তার ওপর। সঠিক উদ্যোগ ছাড়া এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি কেবল ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেবে।

