শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অর্ধশতাব্দীর সীরতুন্নবী (সা.) আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে লাখো মানুষের ঢল

অনলাইন ডেস্ক
- Advertisement -
Single page 1st Paragraph

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতীতে আয়োজিত ১৯ দিনব্যাপী ঐতিহাসিক সীরতুন্নবী (সা.) মাহফিলের সমাপনী দিবস বা আখেরি মোনাজাতের দিন আজ ১২ সেপ্টেম্বর। ১৯৭২ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ৫৪ বছর ধরে চলে আসা এই মাহফিলকে ঘিরে পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামে ভিন্ন এক আমেজ বিরাজ করছে। আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে  লাখো মানুষের ঢল নেমেছে। ফলে মানুষের সমাগমে থমকে গেছে পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রাম।

আজ মাহফিলের শেষ দিনে সকাল থেকে চুনতীর দিকে যত এগোনো যায়, ততই যেন বদলে যেতে থাকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের চেনা দৃশ্যপট। সড়কে মানুষের ঢল, চারপাশে সাদা টুপি ও পাঞ্জাবির সারি, দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের পদচারণা। চুনতীর ১৩ একরজুড়ে বিস্তৃত সীরাত ময়দান ছাপিয়ে মানুষের ভিড় ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের সড়ক ও জনপদে। কারও গন্তব্য মাহফিলের মূল প্যান্ডেলের দিকে, কারও অপেক্ষা আখেরি মোনাজাতের। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা ছাড়িয়ে বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজারসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে এখানে ছুটে আসেন লাখো মানুষ।

চুনতীর এই মাহফিলের বিশেষত্ব শুধু বিশাল জনসমাগমে নয়; ১৯ দিন ধরে এখানে চলে এক বিরল আয়োজন—মাহফিলে আগত মানুষের জন্য প্রতিদিন থাকে খাবারের ব্যবস্থা। বিশাল মূল প্যান্ডেলে চলে সীরতুন্নবী (সা.)-এর আলোচনা। ক্ষুধা লাগলে পাশের খাবারের প্যান্ডেলে গিয়ে খাবার খেয়ে আবার ফিরে আসেন মানুষজন। ধর্মীয় আলোচনা, ইবাদত আর মানুষের জন্য খাবারের এই সমন্বিত আয়োজনই এই মাহফিলকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। এবারের আয়োজনটি ৫৬তম আন্তর্জাতিক মাহফিল; গত ২৫ আগস্ট শুরু হওয়া মাহফিল আজ আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে।

সমাপনী দিনে সকাল থেকে রয়েছে একাধিক অধিবেশন। ১৯ দিন ধরে যে মাঠে নবীপ্রেম, সীরাতের শিক্ষা ও ইসলামী জীবনদর্শনের আলোচনা হয়েছে, আজ সেই মাঠেই এক সঙ্গে অসংখ্য মানুষের হাত উঠবে মোনাজাতের জন্য।

সকাল ৯টায় শুরু হয়েছে আলোচনা, খুৎবায়ে ছদর, সমাপনী বক্তব্য এবং মিলাদ শরিফের পর শুরু হবে আখেরি মোনাজাত। লাখ লাখ মানুষের ‘আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে সেই মোনাজাত শেষ হবে ফজরের আজানের আগে। এরপর সালাতুল ফজর আদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের আয়োজন।

১৯৭২ সালে আয়োজনের শুরু :

চুনতীর এই ঐতিহাসিক মাহফিলের সূচনা করেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের আধ্যাত্মিক সাধক হযরত আলহাজ শাহ মাওলানা হাফেজ আহমদ (রহ.); যিনি ‘শাহ সাহেব কেবলা চুনতী’ বা শাহ সাহেব হুজুর নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন। সীরতুন্নবী (সা.) তথা আল-কোরআনের শিক্ষা এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শ মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭২ সালে তিনি এ মাহফিল শুরু করেন।

শাহ সাহেব কেবলা বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ প্রদত্ত সত্য এবং রাসুল (সা.) প্রদর্শিত জীবনাদর্শ থেকে বিচ্যুতিই মুসলিম সমাজের দুরবস্থা ও অধঃপতনের অন্যতম কারণ। তাই সীরতুন্নবী (সা.)-এর শিক্ষা মানুষের জীবনে ছড়িয়ে দেওয়াকেই তিনি নিজের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন। শুরুতে একদিনে সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে মাহফিলের পরিধি বাড়তে থাকে।

১৯৭২ সালে একদিন, ১৯৭৩ সালে দুইদিন, ১৯৭৪ সালে তিনদিন, ১৯৭৫ সালে পাঁচ দিন, ১৯৭৬ সালে ১০ দিন, ১৯৭৭ সালে ১২ দিন এবং ১৯৭৯ সালে এসে তা ১৯ দিনে উন্নীত হয়। এরপর থেকে ১৯ দিনের ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এ মাহফিল।

মাহফিল পরিচালনা কমিটি, শাহ মঞ্জিল চুনতীর প্রেস সচিব মোহাম্মদ সোহেল তাজ বাসসকে বলেন, ‘মাহফিলের সঙ্গে খাবারের ব্যবস্থা যুক্ত করার পেছনে ছিল শাহ সাহেব কেবলার একটি মানবিক চিন্তা। তিনি মনে করতেন, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ওয়াজ শুনতে এসে যেন না খেয়ে থাকতে বাধ্য না হন। পুরোনো বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি বলতেন—ওয়াজ শুনে মানুষ উপবাসে থেকে রাতে বাড়ি ফিরে স্ত্রী-সন্তানদের ওপর যেন বাড়তি কষ্ট না চাপায়, সে জন্যই খাবারের এই ব্যবস্থা। এরপর বছর গড়িয়েছে, মাহফিলের পরিধি বেড়েছে, মানুষের সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু খাবারের এই আয়োজন বন্ধ হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘এবারও ১৯ দিনব্যাপী মূল মাহফিলের পাশেই খাবারের প্যান্ডেলে মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে একজন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাহফিলে অবস্থান করলেও খাবারের জন্য তাকে আলাদা কোথাও যেতে হয় না। মূল প্যান্ডেলে সীরাতের আলোচনা শুনছেন, প্রয়োজন হলে পাশের প্যান্ডেলে গিয়ে খাবার খেয়ে আবার ফিরে আসছেন—দীর্ঘ এই আয়োজনের মধ্যে এটিই চুনতীর মাহফিলের অন্যতম ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৯ দিন ধরে এমন একটি আয়োজন পরিচালনা করা সহজ নয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এই ব্যবস্থাই চলে আসছে। এ কারণেই চুনতীর মাহফিল কেবল একটি নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের আয়োজন হয়ে থাকেনি; ধীরে ধীরে এটি দক্ষিণ চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে পরিচিত একটি ঐতিহাসিক ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।

প্রসঙ্গত, মাহফিলের প্রবক্তা হযরত শাহ মাওলানা হাফেজ আহমদ (রহ.) ছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক ও ইসলামী চিন্তাবিদ। ১৯০৭ সালে চুনতীর এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চুনতী, চট্টগ্রাম ও কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। জীবনের একটি দীর্ঘ সময় তিনি আধ্যাত্মিক সাধনায় কাটিয়েছেন। লোকালয় ছেড়ে পাহাড়, অরণ্য, গ্রাম-গঞ্জ ও বিভিন্ন জনপদে ঘুরে বেড়িয়েছেন—এমন বর্ণনাও পাওয়া যায়। পরে মানুষের কাছে ফিরে এসে ইসলামের শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক দর্শন প্রচারে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তাঁর চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং রাসুল (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ। সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিল ছিল সেই চিন্তারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। ১৯৮৩ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন। চুনতীর ১৩ একর আয়তনের সীরাত ময়দানের পাশে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত বায়তুল্লাহ জামে মসজিদের দক্ষিণ পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে।

এই বিভাগের সব খবর

কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গঠনে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি সমৃদ্ধ ও কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দেশপ্রেমিক নাগরিক, ব্যবসায়ী, তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষকসহ সমাজের সর্বস্তরের জনসাধারণকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। আজ শনিবার...

শীতলক্ষ্যায় গোসল করতে নেমে নিখোঁজ ৪: নারীসহ ৩ জনের মরদেহ উদ্ধার

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের লাখপুর গ্রামে শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসলে নেমে নিখোঁজ চারজনের মধ্যে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। আজ শনিবার (১২...

জীবনসঙ্গীকে খুঁজে পেয়েছেন মিমি চক্রবর্তী, ডিসেম্বরে বিয়ের গুঞ্জন

টালিউডের অন্যতম এলিজিবল ব্যাচেলর, জনপ্রিয় ও প্রথম সারির অভিনেত্রী মিমি চক্রবর্তীর বিয়ে নিয়ে নতুন করে সরগরম হয়ে উঠেছে ওপার বাংলার বিনোদন দুনিয়া। ৩৭ বছর...

সর্বশেষ

কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গঠনে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি সমৃদ্ধ ও কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে...

শীতলক্ষ্যায় গোসল করতে নেমে নিখোঁজ ৪: নারীসহ ৩ জনের মরদেহ উদ্ধার

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের লাখপুর গ্রামে শীতলক্ষ্যা নদীতে...

জীবনসঙ্গীকে খুঁজে পেয়েছেন মিমি চক্রবর্তী, ডিসেম্বরে বিয়ের গুঞ্জন

টালিউডের অন্যতম এলিজিবল ব্যাচেলর, জনপ্রিয় ও প্রথম সারির অভিনেত্রী...

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ৩ মাসব্যাপী অভিযান উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর

ডেঙ্গু পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলা ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে...

এসএসসি পুনর্নিরীক্ষায় ফল পরিবর্তন হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি নির্দেশনা

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার পুনর্নিরীক্ষণে যেসব শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন...

‘জটিল হৃদরোগ চিকিৎসায় এগিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম’

জটিল হৃদরোগের চিকিৎসায় সক্ষমতা বাড়ছে চট্টগ্রামের। আধুনিক ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসা...