সম্প্রতি এক ভয়াবহ তথ্য জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে—৬ মাসের শিশুর রক্তেও পাওয়া গেছে ভারী ধাতুর (হেভি মেটাল) উপস্থিতি। এই খবরটি যেমন শঙ্কার, তেমনি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় সতর্কবার্তা। এই প্রেক্ষাপটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক উদ্যোগ ও পরিকল্পনাগুলো আশার আলো দেখাচ্ছে।
সমস্যার মূলে: অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের ব্যবহার
আমাদের কৃষিতে অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার দীর্ঘকাল ধরে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাটি, পানি ও ফসলের মাধ্যমে এই ক্ষতিকর উপাদানগুলো সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে, যার পরিণাম হিসেবে নবজাতকের রক্তেও মিলছে ভারী ধাতু। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের কৃষি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের ত্রুটির একটি ভয়াবহ প্রতিফলন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিশ্রুতি ও কর্মপরিকল্পনা:
সম্প্রতি কীটনাশক সংক্রান্ত পিটিএসি (PTAC) সভায় কৃষিমন্ত্রী নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারের অগ্রাধিকারগুলোর কথা তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে, তা হলো:
নিরাপদ খাদ্য ও রপ্তানি:
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে গুণমান নিশ্চিত করা।
জৈব কৃষির প্রসার:
রাসায়নিক বালাইনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সার ও জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি করা।
মান নিয়ন্ত্রণ ও আমদানি:
বালাইনাশক আমদানির ক্ষেত্রে কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং মানসম্মত পণ্য আমদানিতে নজর দেওয়া।
ক্ষতিকর বালাইনাশক নিষিদ্ধকরণ:
পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সব ধরণের ক্ষতিকর বালাইনাশক নিষিদ্ধ করা।
কৃষক সুরক্ষা:
নকল ও ভেজাল বালাইনাশক থেকে কৃষকদের সুরক্ষা প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা যুগোপযোগী করা।
প্রত্যাশা ও শঙ্কা:
কৃষিমন্ত্রীর এই সাহসী পদক্ষেপ ও পরিকল্পনাগুলো নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং আশাব্যঞ্জক। দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে কৃষি খাতকে বিষমুক্ত করার এই উদ্যোগ সফল হলে তা দেশের মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বড় রক্ষাকবচ হবে।
তবে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, শক্তিশালী সিন্ডিকেট এবং অতীতে বিভিন্ন ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে বাধা পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে জনগণের মনে এক ধরণের শঙ্কা থেকেই যায়। অতীতেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ নীতি বা উদ্যোগ মাঝপথে থমকে গেছে। তাই এবারের পরিকল্পনাগুলো যেন কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
আমাদের প্রত্যাশা, মন্ত্রী মহোদয় তার ঘোষিত এই সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে অটল থাকবেন এবং সব ধরণের প্রতিকূলতা জয় করে একটি বিষমুক্ত কৃষি ব্যবস্থা উপহার দেবেন। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় এই সংস্কার কেবল প্রয়োজনই নয়, অপরিহার্য।

