অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতি পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারে সরকার একটি সমন্বিত পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো গ্রহণ করেছে।
আজ রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভা-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভায় সভাপতিত্ব করেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক এই কাঠামো আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়নের রূপরেখা হিসেবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, ‘এটি মূলত পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি রোডম্যাপ।’
আমীর খসরু বলেন, এই কাঠামো বর্তমান নির্বাচিত সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কারই এই পরিকল্পনার প্রথম ও প্রধান ভিত্তি।
তিনি জানান, বিচার ও আইনগত সেবার সম্প্রসারণ, প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সরকারি ব্যয়ে ধারাবাহিকতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে বহুবর্ষী সরকারি কর্মসূচি পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এই কৌশলগত কাঠামোর আলোকে প্রণয়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্প পর্যালোচনা করে যেগুলোর অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নেই সেগুলো বাদ দেওয়া হবে।
অনেক প্রকল্প যথাযথ অগ্রাধিকার ছাড়াই নেওয়া হয়েছিল। কিছুু প্রকল্পে অদক্ষতা, অপচয় এমনকি দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতাও ছিল, বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, যে প্রকল্প দেশের মানুষ বা অর্থনীতির জন্য উপকারী নয়, তা চালিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।
আমীর খসরু বলেন, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, আমরা কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি চাই না। প্রতিটি বিনিয়োগকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ খাতে সরকারের বিনিয়োগ বৃদ্ধির কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সাধারণ ডিগ্রি অর্জনের পর যাতে তরুণরা বেকার না থাকে, সে জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি ও সনদ ব্যবস্থাসহ আরও কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এসব খাতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই।
বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের নেতৃত্ব, অঙ্গীকার ও গতিশীলতাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তিনি বলেন, এই সরকার তিন মাসেই প্রমাণ করেছে যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
এদিকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’-এর আওতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপি পাঁচটি প্রধান ভিত্তির ওপর সাজানো হয়েছে।’
এর মধ্যে প্রথম ভিত্তি ‘রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার সংস্কার’-এ বিচারিক ও আইনগত সেবার সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’
দ্বিতীয় ভিত্তি ‘বৈষম্যহীন সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন’-এ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কারিগরি শিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় ভিত্তি ‘ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার’-এ জ্বালানি নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবহন অবকাঠামো, শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চতুর্থ ভিত্তি ‘সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন’-এ উত্তরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা, পার্বত্য অঞ্চল এবং বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়ন উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম ও মোংলাকে লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং উপকূলীয় সুরক্ষা অবকাঠামো জোরদারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
পঞ্চম ভিত্তি ‘ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতি’-তে সামাজিক সম্প্রীতি, সাংস্কৃতিক বিকাশ, যুব দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নমূলক কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় মনে করছে, সংস্কারভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই এই উন্নয়ন কাঠামো সুশাসন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, আঞ্চলিক ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

