মাইজভাণ্ডারে উঠেছে তৌহিদের নিশানা , ঘুমাইওনা মায়া ঘুমে আখেরি জামানা। স্কুল খুইলাছেরে মওলা স্কুল খুইলাছে গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী স্কুল খুইলাছে। ইত্যাদি মাইজভাণ্ডারী কালাম পরিবেশনের মাধ্যমে ঢোলবাদ্য বাজিয়ে, সাথে সবুজ পতাকা ও ব্যানারে তরিক্বতের বিভিন্ন বানী,আল্লাহ, রাসুল (দ.) ও মাইজভাণ্ডারী তরিক্বতের তকবির সহকারে গরু, মহিষ, ছাগলসহ বিভিন্ন হাদিয়া নিয়ে দলে দলে ভক্ত-আশেকরা আসছেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে।
আজ ২৪ জানুয়ারি গাউছুল আজম হযরত মাওলানা শাহছুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর (ক.) ১২০তম বার্ষিক ওরশ শরীফে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ ওরশকে কেন্দ্র করে গত এক সপ্তাহ ধরে আসতে শুরু করেছেন ভক্ত-আশেকেরা। আজ প্রধান দিবসের দিন ঢল নেমেছে মানুষের। সরেজমিনে দেখা যায়, দরবারের রওজায় রওজায় চলছে ভক্ত-আশেকের ইবাদতবন্দেগী, জিকির আজগার, মিলাদ মাহফিল ও জিয়ারত। ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঢোলবাদ্য বাজনা ও মাইজভাণ্ডারী কালাম পরিবেশন। এককথায় মুখরিত হয়ে ওঠেছে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ। রওজা শরীফ গোসল ও গিলাফ চড়ানোর মাধ্যমে ওরশের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। আজ শনিবার (২৪ জানুয়ারি) প্রধান দিবসের দিন স্ব স্ব মনজিলে কেন্দ্রীয় মিলাদ মাহ্ফিল ও আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করবেন স্ব স্ব মনজিলের প্রধানরা। আজ বা’দ ফজর হুজুর গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী’র রওজা শরীফ জিয়ারতকালে মানবতার মুক্তি ও কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী(ম.)। এসময় তিনি বলেন, “হুজুর গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) আমাদের মাঝে ইসলামের যে আধ্যাত্মিক দর্শন দিয়ে গেছেন এতে আছে উসূলে সাবা, ধর্মসাম্য, ধনসাম্য এবং বিচারসাম্য। ইসলাম যে আত্মসমর্পণের কথা বলেছে, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সমাজে যে শান্তি কায়েম করতে চেয়েছে সেই নির্দেশনা আছে হুজুর গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী প্রবর্তিত যুগপোযোগী মাইজভাণ্ডারী দর্শনে৷”
এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষেও নেওয়া হয়েছে ব্যপক প্রস্তুতি। ওরশ শরীফ উদযাপন উপলক্ষে ইতোমধ্যে ফটিকছড়ি উপজেলা প্রশাসনের সাথে আহমদিয়া মনজিল ও গাউছিয়া হক মনজিলের প্রশাসনিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় ওরশ শরীফ সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা, দেশ-বিদেশ হতে আগত ভক্ত-আশেক ও জায়েরীনদের সুবিধার্থে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা, বিভিন্ন হোটেল খাবারের দাম নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ম্যাজিস্ট্রেট, পর্যাপ্ত পুলিশ, আনসার মোতায়েনসহ মঞ্জিলের স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। ভ্রাম্যমাণ ম্যাজিস্ট্রেটসহ তিনস্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনি রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। এছাড়া প্রশাসনের সমন্বয়ে রয়েছে মনজিল কর্তৃপক্ষের হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন ‘ওরশ উপলক্ষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, স্পেশাল পুলিশ ফোর্স, পুরুষ-মহিলা আনসার টিম দায়িত্বে আছেন। এছাড়া বিভিন্ন মঞ্জিলের সমন্বয়ে আগত ভক্ত-আশেকের সুবিধার্থে ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে।’ এদিকে, ওরশ শরীফে প্রায় ২০ লাখ মানুষের সমাগম হবে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন মঞ্জিলের দায়িত্বশীলরা। দরবারে গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিলের শাহজাদা সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইন সোহেল মাইজভাণ্ডারী বলেন, ‘গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর ওরশ শরীফে বংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, বার্মা, ইরাক, ইরান, তুরস্ক সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানসহ লাখো সুফি ভক্ত-আশেকের সমাগম ঘটে। আমরা ১০ দিনব্যাপী হযরতের মানবিক গুণাবলীর সমন্বয়ে মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছি।’
শাহ এমদাদীয়ার নায়েবে শাজ্জাদানশীন সৈয়দ ইরফানুল হক মাইজভাণ্ডারী বলেন, ‘গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর ওরশে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা লাখো ভক্তের সুবিধার্থে থাকা-খাওয়া, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য লাইটিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ মাইজভাণ্ডারী গাউসিয়া হক কমিটি বাংলাদেশ ও ওরশ এন্তেজামিয়া পর্ষদের সভাপতি রেজাউল আলী জসিম চৌধুরী বলেন,মাইজভাণ্ডারী গাউসিয়া হক কমিটি বাংলাদেশ ও শাহানশাহ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী ট্রাস্টের উদ্যেগে দশদিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করছে। ‘গাউসিয়া হক মঞ্জিল কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় আশেক-ভক্তদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে মনজিলের সেচ্ছাসেবকরা মাইজভাণ্ডার শরীফ,নাজিরহাট,বিবিরহাট,হাটহাজারীসহ বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির সদস্যরা নাজিরহাট ঝংকার মোড় থেকে মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফের এলাকাজুড়ে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া নগরির মুরাদপুর থেকে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ পর্যন্ত বিআরটিসি’র বিশেষ বাস সার্ভিস চালু রয়েছে। এছাড়া ওরশ শরীফ কেন্দ্র করে বসেছে গ্রামীণ লোকজ মেলা। মেলায় পোষাক,রকমারী খাবার গৃহস্থালি প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। দা ছুরি বটি,বেত সামগ্রী, বেড়া, চাটাই, মাছধরার ফাঁদ, হাতপাখা, মোড়া, ফুলদানি,হাঁড়ি পাতিলসহ ঘরে ব্যবহারের ব্যবহারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যায়। তাই মাঘের মেলার জন্য ঘরের বউ ঝিঁয়েরাও অপেক্ষয় থাকে। স্থাণীয়দের পাশাপাশি উপজাতীরাও এ মেলায় ছুটে আসে।
এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ বড় বড় সাইজের জাপনী মুলা বিক্রি যা ভাণ্ডারী মূলা নামে খ্যাত। মেলার বিভিন্ন স্থানে জমজমাট মূলা বিক্রির দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।
