দেশের তিন পার্বত্য জেলায় কাজু বাদাম ও কপি চাষে অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে সরকারী-বেসরকারীভাবে এ চাষে সফলতা দেখা দেওয়ায় দিনদিন আগ্রহী হয়ে উঠছে এখানকার কৃষক। পাহাড়ের আবহাওয়া-মাটি উপযোগী হওয়ায় কৃষি অধিদপ্তরের মাধ্যমে কাজুবাদাম ও কপি চাষের উদ্যোগ নেয় সরকার। এ ধারাবাহিকতায় বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি কুমারী চাককাটা এলাকায় কোটি টাকা খরচ করে ৩ লক্ষ কাজুবাদাম ও কপি চারা উৎপাদন করেছেন এক ব্যক্তি। কৃষি বিভাগের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে সরবরাহের লক্ষে এ চারা উৎপাদন করা হলেও, এখন তিনি প্রকল্পে চারা সরবরাহ করতে না পেরে মহা বিপাকে পড়েছেন। চারাগুলো চলতি মৌসুমে প্রকল্পের প্রদর্শনীতে সরবরাহ করতে না পারলে নার্সারী মালিক আর্থিকভাবে তিন কোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। তাই চারা সরবরাহে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন, নার্সারী মালিক নুর মোহাম্মদ।
জানা যায়, সরকার দেশের জনগনের কর্ম সংস্থান ও পুষ্টি চাহিদা মেটানোর লক্ষে বাৎসরিক ১৫ হাজার টন কাজু বাদাম উৎপাদনের লক্ষমাত্রা নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ‘কাজু বাদাম ও কপি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ’ নামের একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। ২০২১ সাল থেকে বিদেশ থেকে উন্নত জাতের বীজ আমদানির মাধ্যমে চারা উৎপাদন করে উল্লেখিত প্রকল্পে সরবরাহ করে আসছে মেসার্স এন.আর মেরিন এন্ড সার্ভিসেস ও এন.আর অগ্রো রিসোর্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। অন্য বছরের মত চলতি ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের জন্যও এ প্রতিষ্ঠানটি দেড় লক্ষ কাজু বাদাম ও দেড় লক্ষ কপি চারা উৎপাদন করে। উৎপাদিত চারাগুলো প্রকল্পের আওতায় কৃষি অফিসের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রদর্শনী স্থাপনে সরবরাহ করা হত। বর্ষা মৌসুমে জমিতে কিংবা পাহাড়ে লাগানোর উপর্যুক্ত সময়। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পট পরিবর্তনের কারণে উৎপাদিত চারাগুলো এখনো প্রকল্পে সরবরাহ করা যায়নি। চলতি বর্ষায় চারাগুলো প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের মাঝে সরবরাহ করতে না পারলে বা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমিতে রোপন করতে না পারলে দেশের কৃষি উন্নয়ন ব্যাঘাতের পাশাপাশি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন চারা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি।
উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের চাষী তৈদুরাম ত্রিপুরা বলেন, হর্টিকালচারের সহযোগিতায় ১০ একর পাহাড়ি জমিতে কপি চাষ করেছি। গত কয়েক বছর ধরে এখাানের উৎপাদিত কপি প্রক্রিয়া জাত শেষে এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজার জাত হচ্ছে। এ সফলতা দেখে ইতিমধ্যে উপজেলায় সরকারী-বেসরকারীভাবে আরও শত শত কৃষক কপি ও কাজু বাদাম চাষ করেছেন বলে জানান, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুকুমার দেওয়ানজী।
সরেজমিন উপজেলার কুমারী নীচ পাড়া-ফাঁসিয়াখালী সড়কের চাক কাটাস্থ নুর মোহাম্মদের নার্সারীতে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশেই প্রায় ৫ একর জমি জুড়ে রয়েছে কাজু বাদাম ও কপি চারা। চারাগুলোর বয়স প্রায় এক বছর। এতে ৩ লক্ষ চারা রয়েছে। প্রতিদিন ১৫-২০জন শ্রমিক নার্সারীর চারাগুলো পরিচর্যা করছেন বলে জানান কর্মরত শ্রমিক আবুল কাশেম।
কাজু বাদাম ও কুিপ চারা উৎপাদনের সত্যতা নিশ্চিত করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্তাধিকারী নুর মোহাম্মদ বলেন, বিগত কযেক বছর ধরে আমি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রদর্শনীর জন্য কপি ও কাজু বাদাম চারা সরবরাহ করে আসছি। এ ধারাবাহিকতায় চলতি মৌসুমেও চাহিদা মোতাবেক তিন লক্ষ চারা উৎপাদন করেছি। উৎপাদিত চারাগুলোর বয়স প্রায় এক বছর হয়ে গেছে। কিন্তু চারাগুলো এখনো প্রকল্পে সরবরাহ করতে পারিনি। চলতি বর্ষা মৌসুমে চারাগুলো প্রকল্পে সরবরাহের মাধ্যমে পাহাড়-জমিতে রোপন করা না হলে অকেজো হয়ে পড়বে। এতে আমি প্রায় ৩ কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হবো। আর দেনার দায়ে আমাকে বাড়ি ঘর ছেড়ে পালাতে হবে। কারণ সরকারী বেসরকারী বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্টান থেকে ঋণ নিয়ে চারাগুলো উৎপাদন করেছি।
লামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আশরাফুজ্জামান জানান, নুর মোহাম্মদের নার্সারীতে কাজু বাদাম ও কপি চারা উৎপাদনের বিষয়ে অবগত আছি। এ বছর প্রকল্পে চারা সরবরাহের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দ্রুত অবগত করা হবে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খামার বাড়ি ঢাকার ‘কাজু বাদাম ও কপি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক শহীদুল ইসলাম জানায়, কাজুবাদাম ও কপি চারা ক্রয়ের চাহিদা ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের পাশাপাশি নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছি। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে একটু দেরি হলেও আশা করি চলতি মাসের মধ্যে চারা ক্রয়ের বরাদ্দ অনুমোদন পাওয়া যাবে।
৩ লক্ষ কাজুবাদাম ও কপি চারা উৎপাদন
লামায় কাজুবাদাম ও কপি প্রকল্পে চারা সরবরাহ নিয়ে বিপাকে নার্সারী মালিক : ৩ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা
সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা
মো. নুরুল করিম আরমান, লামা প্রতিনিধি

