বন্দরনগরী চট্টগ্রামে আবারও তীব্রভাবে করোনা সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। দেশে সংক্রমণ বৃদ্ধিতে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর। চলতি বছরের শুরুতে চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভাগে করোনা সংক্রমণের সংখ্যা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি থাকলেও প্রতিদিনই সেটি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এদিকে চট্টগ্রামে করোনার সংক্রমণ দিন দিন বাড়তে থাকলেও সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধ মানছেনা মানুষ। অধিকাংশ মানুষের মুখে মাস্কর নেই, স্বাস্থ্যবিধি মানার কোন আগ্রহই নেই তাদের। আবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে যত সিট ততো যাত্রী নিয়ে বাস চলার নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। নগরীর বিভিন্ন বাসে নির্ধারিত আসনের অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে বাস চলাচল করতে দেখা গেছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মানার ব্যাপারে উদাসীন ছিল বাসযাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকরা। একই সাথে কাঁচা বাজার ও মার্কেটে গিজগিজ করছে মানুষ।
স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পাঠানো করোনা সংক্রান্ত নিয়মিত বুলেটিন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের শুরুর দিনে অর্থাৎ ১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগরীতে করোনায় আক্রান্ত শনাক্ত ছিলেন মাত্র ৯ জন। এ দিন পুরো চট্টগ্রাম বিভাগে আক্রান্ত শনাক্ত ছিলেন মাত্র ১৭ জন। পরদিন ২ জানুয়ারি সেটি বেড়ে মহানগরে ১৬ জন এবং বিভাগে মোট ৩২ জন আক্রান্ত শনাক্ত হন। এভাবে সংক্রমণের হার প্রতিদিন বৃদ্ধি পেতে পেতে গত ১৪ জানুয়ারি মহানগরে ২৯৬ জন আক্রান্ত শনাক্ত হন। চট্টগ্রাম বিভাগে এই সংখ্যা ছিল মোট ৪১৮ জন। এর পরদিন ১৫ জানুয়ারি সংক্রমণ কিছুটা কমে ২৩৯ জনে নেমে আসে। এদিন মহানগরে আক্রান্ত শনাক্ত হন ৩৭৫ জন। এর পরদিন ১৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগরে আক্রান্ত শনাক্ত বেড়ে ৫৫০ জনে দাঁড়ায়। মহানগরে এই সংখ্যা ছিল ৬৭৬ জন। ১৭ জানুয়ারি আক্রান্ত শনাক্ত আরও বেড়ে মহানগরে ৭৪২ জনে পৌঁছায়। পাশাপাশি বিভাগে আক্রান্ত শনাক্ত হন ৯৫১ জন। ১৯ জানুয়ারি, চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৮৯, বিভাগে ১৪০৮ জন, এরপর দিন ১৮ জানুয়ারি এই সংখ্যা মহানগরে আগের দিনের তুলনায় কিছুটা কমে ৭৩৮-এ নেমে আসে। তবে বিভাগে মোট আক্রান্ত শনাক্ত আগের দিনে তুলনায় বেড়ে ১ হাজার ৪৫ জনে পৌঁছায়।
কিন্তু এরপর দিনই চট্টগ্রাম মহানগরে আক্রান্ত শনাক্ত রেকর্ড সংখ্যক বেড়ে ৯৮৯ জনে পৌঁছেছে! একইসঙ্গে বিভাগেও মোট আক্রান্ত বেড়ে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০৮ জনে পৌঁছায় যা দ্রুত সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার আলামত। এভাবে সংক্রমণ যদি লাফিয়ে বাড়তে থাকে তবে শীঘ্রই রেড জোনে পরিণত হবে বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম।
এদিকে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী বলেন, যেভাবে সংক্রমণ বাড়ছে, তাতে হাসপাতালেও রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে বেশিরভাগ হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তি হওয়া শুরু হয়েছে। তবে আমরা রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিতের বিষয়ে প্রস্তুত আছি। ইতোমধ্যে আমরা হাসপাতাল সংশিষ্টদেরও বলেছি, তারাও যেন প্রস্তুত থাকেন। আশা করছি কোনো সমস্যা হবে না।
এদিকে চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এবারে নতুন করে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এক্ষেত্রে একইসঙ্গে আবার রোগীর ডায়রিয়া হচ্ছে। বমিও করছেন। এমন সব উপসর্গ দেখতে পাচ্ছেন কর্মরত চিকিৎসকরা।
চট্টগ্রামে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রক্তের ঘনত্ব নির্ভর করে রক্তের সোডিয়ামের পরিমাণের ওপর। তাই রক্তে কোনো কারণে সোডিয়ামের মাত্রা এদিক-সেদিক হলে রক্তের ঘনত্ব পাল্টে যায়। রক্তে সোডিয়ামের স্বাভাবিক মাত্রা থাকে প্রতি লিটারে ১৩৬-১৪৫ মিলিমোল। রক্তে সোডিয়াম কমে গেলে তাকে ‘হাইপোনেট্রেমিয়া’ বলা হয়। হাইপোনেট্রেমিয়ায় বমি ভাব, নিস্তেজ ভাব, দুর্বলতা, অসংলগ্ন কথাবার্তা, চিন্তাভাবনা থেকে শুরু করে খিঁচুনি ও এমনকি অজ্ঞান হয়ে পড়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসক ডা. কামরুল আলম বলেন, করোনার আগের ভ্যারিয়েন্টগুলোতেও ডায়রিয়া বা বমি হতো। কিন্তু বর্তমানে এই লক্ষণগুলো প্রকট আকারে দেখা যাচ্ছে। এটা হয়তো নতুন ভ্যারিয়েন্টের কারণে হচ্ছে। তবে নিশ্চিত নই। যেহেতু এখন পর্যন্ত নতুন ভ্যারিয়েন্টের জিনোম সিকোয়েন্সও সেভাবে হয়নি।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্ববধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বী বলেন, আসলে নতুন ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়েছে কিনা সেটা এখনও জানা যায়নি। আমাদের এখানে জিনোম সিকোয়েন্স করার সুবিধাটাও অত বেশি তো না। তবে আমরা রোগীদের উপসর্গ দেখে চিকিৎসা দিচ্ছি।

