বিএনপির সরকার বিরোধী আন্দোলনের মিত্র জোট গুলোতে চলছে টানাপোড়েন। শরিক জোট ও দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আন্দোলনে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ এবং সর্বোপরি যুগপৎ আন্দোলনের ‘অভিন্ন রূপরেখার যৌথ ঘোষণা’ ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে বিএনপিতে এখন টালমাটাল অবস্থা।
সরকারবিরোধী কঠোর আন্দোলন করতে গিয়ে কঠিন চাপের মুখে পড়েছে বিএনপি। নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনের দাবি আদায়ে চূড়ান্ত আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল দলটি। দাবি আদায়ে সরকারের ওপর ‘চাপ’ তৈরি করতে গিয়ে এখন উল্টো নিজেরাই পড়েছে বিপাকে। বিএনপি জোট শরীক ‘গনতন্ত্র মঞ্চ’ থেকে বেরিয়ে গেছে ড.রেজা ও ভিপি নূরের রাজনৈতিক দল গণঅধিকার পরিষদ। রমজানের আগে ১২ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গিয়েছে ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের দল বাংলাদেশ লেবার পাটি।
এদিকে এরই মধ্যে কোনো কোনো শরিক দল বিএনপির কাছে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে যে, ভবিষ্যতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে আসন বণ্টন কেমন হবে। এ নিয়েও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে বিএনপিতে।
বিএনপির নেতৃত্বে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন শুরু হয় গত বছরের ২৪ ডিসেম্বরে। কিন্তু এর কদিন পরই বিএনপির বিরুদ্ধে কোনো কোনো শরিক জোটকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ এনে ১২ দলীয় জোট ভিন্ন অবস্থান নেয়। ওই সময় ১৬ জানুয়ারির বদলে পরদিন ১৭ জানুয়ারি যুগপৎ কর্মসূচি পালন করে এ জোট।
অন্যদিকে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে নেতাকর্মীরা আহত হলেও বিএনপি সহমর্মিতা প্রকাশ করে নিদেনপক্ষে কোনো বিবৃতিও না দেওয়ায় জামায়াত পরবর্তী সময়ে কোনো কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রয়েছে।
একই অবস্থা হয়েছে গণ অধিকার পরিষদের। ড. রেজা কিবরিয়া ও নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন নতুন এ দল গত শনিবার সাতটি রাজনৈতিক দলের জোট গণতন্ত্র মঞ্চ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। গত বছরের ৮ আগস্ট গণতন্ত্র মঞ্চ গঠিত হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর থেকেই মঞ্চের অন্যান্য দলের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে গণ অধিকার পরিষদের মতানৈক্য দেখা দেয়।
দলটির সদস্য সচিব নুরুল হক নুর জানান, এখন থেকে গণতন্ত্র মঞ্চের ব্যানারে গণ অধিকার পরিষদ কোনো কর্মসূচি পালন করবে না। তবে তারা যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি পালন করবে।
গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পাটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা যখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন বেগবান করতে সক্রিয়, বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন করার কথা ভাবছি, তখন গণ অধিকার পরিষদের এ সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই আন্দোলনের ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা দেবে।’
গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ূম বলেন, ‘কোনো সংগঠন যদি মনে করে, গণতন্ত্র মঞ্চে থাকবে না, সে অধিকার তাদের রয়েছে। তবে সরকারবিরোধী দলগুলোর আন্দোলনে বিভক্তির যে চেষ্টা চালানো হচ্ছে, গণ অধিকার পরিষদের সিদ্ধান্ত সেই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করবে। এতে সরকারবিরোধী আন্দোলনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
অভ্যন্তরীণ এ ধরনের মতদ্বৈধতা ও দূরত্বের পাশাপাশি সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের ‘অভিন্ন রূপরেখার যৌথ ঘোষণা’ নিয়েও শরিক জোট ও দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির টানাপড়েন চলছে। বিএনপির ১০ দফার ভিত্তিতে এ যুগপৎ আন্দোলন শুরু হয়েছিল। তবে বিএনপির ১০ দফার পাশাপাশি নিজস্ব ১৪ দফা নিয়েও আন্দোলন করে আসছে গণতন্ত্র মঞ্চ। নিজস্ব ১০ দফা নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের শুরুতে কর্মসূচি পালন করে জামায়াতও। এখন আন্দোলন আরও বেগবান করার পরিকল্পনা করছে বিএনপি ও তার মিত্ররা। শিগগির নতুন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবে তারা। কিন্তু আন্দোলনের চার মাসের বেশি সময় পার হলেও এর ভিত্তি হিসেবে ‘অভিন্ন রূপরেখার যৌথ ঘোষণাপত্র’ এখনও চূড়ান্ত করতে পারেনি দলগুলো।
গত ফেব্রুয়ারিতে যৌথ ঘোষণাপত্রের খসড়া সাত দফা প্রণয়ন করা হলেও তা থেকে এখন বিএনপি অনেকটা সরে এসেছে বলে অভিযোগ তুলেছে গণতন্ত্র মঞ্চ। ফলে এটি চূড়ান্ত করা নিয়ে কিছুটা জটিলতা দেখা দিয়েছে। তা ছাড়া ‘যৌথ ঘোষণাপত্র’ নিয়ে বিএনপি এখনও তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেনি; যে কারণে যুগপৎ আন্দোলনের অন্য শরিকরা কার্যত ধোঁয়াশায় রয়েছে। শরিকদের কেউ কেউ জানান, বিএনপির ১০ দফাকে মানুষ এরই মধ্যে গ্রহণ করেছে। যুগপৎ আন্দোলনের উপযোগী এই ১০ দফা থাকার পরও গণতন্ত্র মঞ্চের চাপে ‘নতুন দফা’ প্রণয়নে বাধ্য হচ্ছে বিএনপি। শরিকদের অনেকে নতুন করে ‘আলাদা দফা’ প্রণয়নের বিরোধী। কিন্তু এ ব্যাপারে প্রধান শরিক বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট নয়।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, গণতন্ত্র মঞ্চ সরকারবিরোধী চূড়ান্ত আন্দোলন শুরুর আগে আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে ‘যৌথ ঘোষণাপত্র’ প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল। বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা গত ফেব্রুয়ারিতে যৌথ ঘোষণার ৭ দফা একটি খসড়াও প্রণয়ন করে। তবে বিএনপি এখন ওই ৭ দফা থেকে সরে এসেছে জানিয়ে মঞ্চের নেতারা বলেন, ‘বৈঠকে বিএনপি আমাদের রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফার ভিত্তিতে যৌথ ঘোষণাপত্র প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছে- যা ৩০, ৩১, ৩২ এমনকি ৩৩ দফা হতে পারে। গণতন্ত্র মঞ্চ জোটগতভাবে আলোচনা করে বিএনপিকে এ ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান জানাবে।’
জানা গেছে, বিএনপি অভিন্ন রূপরেখার একটি যৌথ ঘোষণা প্রস্তুত করতে গণতন্ত্র মঞ্চ বাদে যুগপৎ আন্দোলনের অন্য শরিকদের কাছেও মতামত চেয়েছে। তাদের মধ্যে গণফোরাম (মন্টু) ৫ দফা, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য ১৩ দফা ও লেবার পার্টি ২ দফা দাবি জমা দিয়েছে। জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট তাদের খসড়া দফাসমূহ প্রস্তুত করে আজ সোমবার জমা দেয়ার কথা জানিয়েছেন জোটের সমন্বয়ক ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ।
অন্য শরিক ১২ দলীয় জোট ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পাটির পৃথক কোনো দফা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।
গণফোরামের (মন্টু) সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, খুব কম দফার ভিত্তিতে অভিন্ন রূপরেখার যৌথ ঘোষণা প্রস্তুতের কথা বলেছি। আমাদের মূল দাবি হলো, বর্তমান সরকারকে সরে যেতে হবে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে।
বিএনপি এরই মধ্যে শরিক জোট ও দলগুলোর দেওয়া বিভিন্ন দফা ও মতামত নিয়ে গত শনিবার বৈঠক করেছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলু ও যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এই বৈঠকে ছিলেন বলে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘আমরা সবার দফা নিচ্ছি। এ নিয়ে বৈঠকও হয়েছে। সবকিছু আমরা স্থায়ী কমিটির কাছে হস্তান্তর করব। সেখানেই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। সবকিছু আলোচনার মধ্যে রয়েছে, খুব তাড়াতাড়ি এটা চূড়ান্ত করা হবে।’
আজ সোমবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক রয়েছে। অভিন্ন রূপরেখার যৌথ ঘোষণা নিয়ে সেখানে আলোচনা হতে পারে বলে জানা গেছে। কত দফার ভিত্তিতে যৌথ ঘোষণা প্রণয়ন হচ্ছে, জানতে চাইলে আলাল বলেন, ‘দফাভিত্তিক যৌথ ঘোষণা নাও হতে পারে।’
এ ব্যাপারে আলাল বলেন, ‘২৭ দফার শেষে রয়েছে যে, সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে রাষ্ট্র মেরামতের প্রস্তাব পেলে তা তাতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছেন। শরিকদের দফাগুলোর পাশাপাশি এসব প্রস্তাবও আলোচনার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।’
আসন বণ্টন নিয়েও আলোচনা
এদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে হলে কাকে কয়টি আসন দেওয়া হবে, সে ব্যাপারে এরই মধ্যে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করেছে যুগপৎ আন্দোলনের বিভিন্ন শরিক দল।
বেশ কয়েক নেতা নাম প্রকাশ না করে এ প্রসঙ্গে জানান, ‘নির্বাচনের আর বেশি দেরি নেই। এ অবস্থায় সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করতে চূড়ান্ত আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে। আন্দোলন তুঙ্গে উঠলে বিরোধী নেতাদের ওপর নির্যাতন আসবে। গ্রেপ্তারও হতে পারেন অনেকে। কিন্তু কীসের আশায় আন্দোলন করবেন তারা? এজন্য কোন দল কয়টি আসন পাবে, সে বিষয়টি তারা বিএনপি নেতাদের কাছে উত্থাপন করেছেন।’
১২ দলীয় জোটের এক নেতা জানান, ‘নির্বাচনের আসন বণ্টন নিয়ে কিছু আলাপ-আলোচনা তো হয়েছেই।’ তবে তারা এ-ও জানান, বিএনপি নেতারা এখনও এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কিছু জানাননি।
এ ব্যাপারে ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, ‘সময় হলে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করব। যারা আন্দোলন-সংগ্রামে আছেন, তারা নিশ্চয়ই প্রার্থী বাছাই করতে সক্ষম হবেন। এ ব্যাপারে কোনো সমস্যা হবে না বলেই মনে করি।’
এ ব্যাপারে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘এখন তো আন্দোলনের সময়। এসব বিষয় (আসন বণ্টন) তো আরও অনেক দূরের। সময় হলে সবকিছু নিয়েই আমাদের হাইকমান্ডে আলোচনা হবে।’
বিএনপির দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, আন্দোলন সফল হলে দশ দফা দাবি বাস্তবায়ন সম্ভব হলে নির্বাচনে সবাইকে নিয়ে অংশ গ্রহন করা হবে। আন্দোলনের শরীক দলের সকল শীর্ষ নেতা এবং যার যার এলাকায় বিজয়ী হবার মতো পরিস্থিতি থাকবে তালিকা করে শরীকদের মধ্যে বন্টন করা হবে। তাতে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়।

