সরকার পতন আন্দোলনে থাকা মাঠের বিরোধী দল বিএনপি কর্মসূচী চুড়ান্ত করতে পারছে না। আগামী নভেম্বর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে পারে জাতীয় নির্বাচন। এ নির্বাচন আয়োজনের আগেই সরকারের সাথে একটা দফারফা করতে চাইলেও তারা তা পেরে উঠছে না। কর্মসূচীর পর কর্মসূচী দিয়েও সরকারকে টলানো যাচ্ছে না। বিদেশিদের কাছে বার বার ধর্না দিয়েও সন্তোষজনক তেমন কিছু প্রাপ্তি হচ্ছে না। এখন এস এস সি পরীক্ষার জন্য নতুন কর্মসূচী নিয়ে চিন্তিত বিএনপি ও জোট সঙ্গীরা। ফলে কোন কোন নেতা হতাশ হয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন , বিএনপির আন্দোলনে জনসমর্থন নেই। তারা ব্যর্থ হয়ে পড়ছেন তাদের নেতাকর্মীদের কাছে।আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আন্দোলনের শক্তি দেখিয়ে লাভ হবে। আওয়ামী লীগ আন্দোলনকে ভয় পায় না। আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগের জন্ম।
ঈদ পরবর্তী সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় কালে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, বিএনপি কোন ঈদের পর আন্দোলন শুরু করবে কেউ জানে না। তারা আন্দোলন না করে নির্বাচনের প্রস্তুুতি নিলে ভালো করবেন।
বিএনপির নীতিনিধারণী দুইজন নেতার সাথে কথা বলে জানা গেছে কোরবানের আগেই রাজপথে আন্দোলনের একটি জঙ্গীভাব গড়ে তুলতে চেষ্ঠা করা হচ্ছে। কিন্তু কেমন কর্মসূচী দিলে জনগণ মাঠে থাকবে তাদের সাথে। জানা গেছে , কেউ কেউ রোডমার্চের মতো কর্মসূচী নিয়ে আবার থানা জেলা ও বিভাগে যাবার প্রস্তাব করলেও তা তেমন সাড়া পড়ছে না। হরতাল ছাড়া আর কি কর্মসূচী দেয়া যায় তা নিয়েই ঈদের পর থেকে বিএনপি শরীকদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
আগামী এক-দেড় মাসের মধ্যে অর্থাৎ কোরবানির ঈদের আগেই সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিসহ ১০ দফার ভিত্তিতে চূড়ান্ত আন্দোলন গড়তে চাইছেন। তারা এবার আন্দোলনের গতি ওঠানামা করতে চান না। বড় কর্মসূচি না দিয়ে আবারও সাদামাটা কর্মসূচি দেওয়ার জন্য জোটের শরিকরা পরামর্শ দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে জেলা, মহানগর বা বিভাগীয় পর্যায়ে বড় সমাবেশ, মানববন্ধন অথবা অবস্থান বা ঘেরাও কর্মসূচিও দেওয়া হতে পারে। এরপর জেলা বা বিভাগে রোডমাচের মতো যুগপৎ আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি আসবে। এসব কর্মসূচি নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির আগামী বৈঠকে কর্মসূচি চূড়ান্ত হবে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, চলমান আন্দোলন শুধু বিএনপিকে ক্ষমতায় নেওয়ার জন্য নয়; দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা, মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার ফেরানোর আন্দোলন। দেশের বর্তমান সংকট বিএনপির একার নয়, এটা সমগ্র দেশবাসীর সংকট। এই সরকারকে না সরালে কেউ রেহাই পাবে না। সুতরাং আন্দোলন আরও গতিশীল হবে।
জানা যায়, ইতোমধ্যে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে, সমাবেশ, মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, গণপদযাত্রাসহ একাধিক কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির বেশিরভাগই আর ঘোষণা করা হবে না। ফলে আবারও নতুন করে কোনো ধরনের কর্মসূচি নেওয়া যায়, তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। বিএনপির নীতিনির্ধারকরাও পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করার জন্য আলোচনা অব্যাহত রেখেছেন। সর্বশেষ গত সোমবার রাতে দলটির নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়েছে। এ ছাড়া ঈদুল ফিতরের পর ইতোমধ্যে গণফোরাম, বাংলাদেশ পিপলস পার্টি, ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য ও সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপির সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।
১২ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চলমান যুগপৎ আন্দোলন আরও গতিশীল করতে চূড়ান্ত কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনা চলছে। বিএনপি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে।
জানা যায়, ২০২২ সালের জুলাই থেকে সরকারের পদত্যাগ দাবিতে রাজপথে লাগাতার আন্দোলন শুরু করে বিএনপি। আন্দোলনকালে দেশের বিভিন্ন জেলায় ১৭ নেতাকর্মী নিহত ও অসংখ্য আহত হয়েছেন। কারাগারেও যেতে হয়েছে দলের মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ উল্লেখযোগ্য নেতাকর্মীকে। প্রথমদিকে গণবিরোধী কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার কর্তৃক চাল, ডাল জ্বালানি তেল, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্যবৃদ্ধি, ভোলায় নূরে আলম ও আব্দুর রহিম, নারায়ণগঞ্জে শাওন, মুন্সীগঞ্জে শহিদুল ইসলাম শাওন, যশোরে আব্দুল আলিমসহ মোট পাঁচজন হত্যার প্রতিবাদে, খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে বিভাগীয় গণসমাবেশ করেছে বিএনপি। গত বছরের ১২ ও ১৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম এবং ময়মনসিংহে, ২৯ অক্টোবর রংপুর, ৫ নভেম্বর বরিশাল, ১২ নভেম্বর ফরিদপুর, ১৯ নভেম্বর সিলেট, ২৬ নভেম্বর কুমিল্লা, ৩ ডিসেম্বর রাজশাহী ও সবশেষে ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় গণসমাবেশ করে বিএনপি। ঢাকার সমাবেশ থেকে জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, দলীয় কর্মসূচিতে গুলি করে নেতাকর্মী হত্যার প্রতিবাদ, খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে ধারাবাহিক ওই আন্দোলনের অংশ হিসেবে সারা দেশে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করে আসছে বিএনপি ও সমমনা দল এবং জোটগুলো।
কর্মসূচির ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে এবার পুরো রোজার মাসেই একাধিক কর্মসূচিতে ব্যস্ত ছিল বিএনপি। ইফতার মাহফিল আয়োজনের পাশাপাশি রাজপথের কর্মসূচিতেও সরব ছিলেন দলটির নেতাকর্মীরা। এই রোজাতেই সারা দেশে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে উপজেলা, জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন স্তরে দুই ঘণ্টার ‘অবস্থান কর্মসূচি’ পালন করা হয়েছে। নতুন করে যুগপৎ আন্দোলনের যে কর্মসূচি আসবে, তা আগের চেয়ে জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে রোডমার্চের মতো কিছু কর্মসূচির কথা ভাবা হচ্ছে বলে বিএনপি ও জোটের নেতারা জানিয়েছেন। যদিও রোডমার্চের মতো কর্মসূচি কতটা নির্বিঘেœ করা যাবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে সংশয় আছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আমাদের আন্দোলন ১৫ বছর ধরে চলমান। যদিও কেউ কেউ বলেন, ঈদের আগে পরে, আবার কেউ বলেন ঈদের পরে আন্দোলন। আসলে আন্দোলন ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার মতো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্দোলন কখনো দীর্ঘস্থায়ী, কখনো স্বল্প সময়ের মধ্যে বিজয় লাভ করে। যেমন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, মাত্র ৯ মাসের মধ্যে দেশ স্বাধীন হয়েছে। আবার ভিয়েতনামের যুদ্ধ অনেক দিন চলেছে, দীর্ঘদিন পর তারা স্বাধীন হয়েছে। কোন সরকার কবে যাবে, সেটি নির্ধারিত নয়; এটি নিশ্চিত যে ফ্যাসিবাদের পতন অনিবার্য। এটি করবে দেশের জনগণ। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই সরকারের বিদায় ঘটানো হবে।

