সরকার বিরোধী আন্দোলনকে কৌশলে দমাতে চায় সরকার। বিএনপি নেতাদের শঙ্কা পুরানো মামলা গুলো দ্রুত নিস্পত্তির মাধ্যমে সরকার নির্বাচনের আগে বিএনপি জনপ্রিয় নেতাদের সাজা দিয়ে দিতে পারে। আবার যে সব মাঠ পর্যায়ের নেতারা আন্দোলনে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে তাদেরকেও মামলা দিয়ে গ্রেফতার করতে পারে। এসব কথা বিএনপি চেয়ারর্পাসন কারাবন্দি বেগম খালেদা জিয়াকে অবহিত করা হলে বেগম জিয়া এসবে ভয় না পেয়ে চলমান আন্দোলনকে বেগবান করার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা নানা ইস্যুতে ঘন ঘন বেগম জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করছেন। তিনি সামনে না এলেও নেতাদের মাধ্যমে নানা বক্তব্য কর্মীদেরকে উজ্জীবিত করছেন। বন্দি খালেদা জিয়া যেন এখানেই শক্তিশালি।
এদিকে বিএনপি নেতাদের দাবি- আগামী নির্বাচনের আগে বিভিন্ন মামলায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক নেতার বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণার চক্রান্ত করছে সরকার।
সাজাপ্রাপ্ত হলে বিএনপির ওই নেতারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অযোগ্য হবেন। এর মধ্য দিয়ে বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলার লক্ষ্য ক্ষমতাসীনদের।
জানা যায়,শনিবার ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে গিয়ে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেও বিষয়টি অবহিত করেছেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা। তবে এ নিয়ে চিন্তিত না হয়ে এ মুহ‚র্তে তাদের আন্দোলনে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন খালেদা জিয়া।
তার নির্দেশনা অনুযায়ী চলমান আন্দোলন আরও জোরদার করার পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি। কোরবানি ঈদের আগ পর্যন্ত যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে রোডমার্চ কর্মস‚চি ঘোষণা হতে পারে। এ ছাড়া আগামী ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে রাজধানীতে ব্যাপক শোডাউনের মাধ্যমে ঈদুল ফিতর-পরবর্তী কর্মস‚চি শুরুর প্রস্তুতি চলছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আন্দোলন চলছে, সামনে আন্দোলন আরও বেগবান হবে। সরকারের আচরণেই নির্ভর করবে বিএনপির আন্দোলনের ধরন। জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কর্মস‚চি ঠিক করা হবে।’
সরকারের নতুন কৌশল, বিএনপির শঙ্কা ও দলীয় চেয়ারপারসনের নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে গণমাধ্যমকে কিছু খোলাসা করেননি ফখরুল। খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাক্ষাৎকালে তিনি (খালেদা জিয়া) নেতাদের কুশল এবং দলের যারা কারাগারে আছেন, তাদের সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। দেশের হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে যে মিথ্যা মামলা রয়েছে, সে ব্যাপারেও তিনি অবগত আছেন।
এর আগে গত ১৯ এপ্রিল গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের নেতাদের সাজা দিয়ে আটকে রাখার বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন মির্জা ফখরুল। এর এক দিন আগে শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলার মামলায় বিএনপির সাবেক এমপি হাবিবুল ইসলাম হাবিবসহ চারজনকে যাবজ্জীবন ও অন্য ৪৫ আসামিকে ৭ বছর করে কারাদÐ দেন আদালত। ২০০২ সালে বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় তৎকালীন প্রধান বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় এ মামলা হয়েছিল।
১৯ এপ্রিলের সংবাদ সম্মেলনে ওই মামলার রায় নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘হাবিবুল ইসলাম হাবিবকে সাজা প্রদান সরকারের নীল নকশার অংশ। এটা শুধু হাবিব সাহেব নয়। দেখবেন খুব দ্রæত বিএনপি ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের অনেককেই এই ধরনের মিথ্যা মামলায় সাজা দেবে। ইতোমধ্যে আমরা লক্ষ করছি যে, মামলাগুলো খুব দ্রæত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।’
বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে আসন্ন নির্বাচনের আগেই বিএনপিকে নেতৃত্বশ‚ন্য করার মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনার মধ্যে আছে বিএনপির শীর্ষ নেতাদেরকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে তাদের আটকে রাখা। আর জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা যেমন হাবিবুল ইসলাম হাবিব তিনবারের সংসদ সদস্য, নিজ এলাকায় জনপ্রিয় নেতা- এ রকম নেতাদেরকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে আটকে রাখার একটা প্রক্রিয়া তারা (সরকার) ইতোমধ্যে শুরু করেছে।
ফখরুলের এমন বক্তব্যের পর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। দলটির শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতা বলেছেন, শেষ পর্যন্ত যদি আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়, তাহলে কীভাবে তাদের বেকায়দায় ফেলা যায় তা নিয়ে পাঁয়তারা করছে সরকার। সেজন্য বিএনপির বিপুল সংখ্যক নেতার বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণার তোড়জোড় চলছে। সাজা হলে ওই নেতারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এতে নির্বাচনে গেলেও প্রার্থী সংকটে ভুগতে হবে বিএনপিকে। তবে কোন কোন নেতাদের বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা হতে পারে, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য মেলেনি কারও কাছে।
গত শনিবার খালেদা জিয়ার সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করতে যাওয়া নেতাদের মধ্যে একজন বলেন, দলের চেয়ারপারসনকে জানানো হয়েছে, শীর্ষস্থানীয়সহ জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাড়ে তিন শতাধিক নেতাকে সাজা দেওয়া হতে পারে। কাকে কাকে সাজা দেওয়া হতে পারে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তবে এ তালিকায় দলের মহাসচিব থেকে শুরু করে স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিল ও নির্বাহী কমিটির সদস্যরাও রয়েছে।
শঙ্কার কথা শুনে খালেদা জিয়া কী নির্দেশ দিয়েছেন, সে বিষয়ে বিএনপির একাধিক স‚ত্র জানায়, নেতাদের শঙ্কার কথা শুনে তাদের হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দলের চেয়ারপারসন। তিনি বলেছেন, আমাকে এবং তারেককে (বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান) সাজা দেওয়া হয়েছে। আপনাদের হলে সমস্যা কী? আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের দাবি আদায় হলে প্রয়োজনে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সারির নেতারা নির্বাচনে অংশ নেবেন।
আন্দোলন সঠিক পথে এগোচ্ছে বলে মন্তব্য করে দলের নেতাদের সরকারের কৌশল নিয়ে চিন্তিত না হয়ে আন্দোলনে মনোযোগ বাড়ানোর নির্দেশও দিয়েছেন খালেদা জিয়া।
এদিকে আন্দোলনে যেসব নেতা সক্রিয় হচ্ছেন না বেগম জিয়া তাদের সর্ম্পকে জানতে নেতাদের পরামর্শ দিয়েছেন বলেও বিএনপির ঘনিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। সূত্রটির মতে, খুব শিগগির নিস্ক্রিয় নেতাদের একটি তালিকা করা হবে বলে জানিয়েছে। সেই তালিকা লন্ডনেও চলে যেতে পারে।

