চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ঐতিহাসিক প্রাচীন নিদর্শন মহামুনি বিহার প্রাঙ্গণে আজ ১৩ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) অনষ্ঠিত হচ্ছে দু’শ বছরের আদিবাসী-বাঙালির মিলন মেলা। এটি মহামুনি মেলা হিসেবে পরিচিত লাভ করে। স্থানীয়রা এটি ‘জুম্ম মেলা’ বলে থাকেন।
এবারের মেলায় তিন লক্ষাধিক অধিবাসী আগমন ঘটবে বলে মনে করেন আয়োজকরা। এক সময় মাসব্যাপী এই চললেও বর্তমানে সপ্তাহব্যাপী এই মেলার প্রচলন রয়েছে।
১৩ এপ্রিল সকাল হতে আদিবাসী আবাল-বৃদ্ধবণিতা পায়ে হেঁটে এবং বিভিন্ন যানবাহনে করে উৎসব প্রাঙ্গণ মহামুনি মন্দিরে বুদ্ধের কৃপা নিতে আসবেন। পূজা দিয়ে ও আনন্দ উল্লাস করে পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুনবছরকে বরণ করে নিবেন তারা। পূণ্যার্থীদের স্বাগত জানাতে নানা আয়োজন করেছেন মন্দির কর্তৃপক্ষ। মহামুনি বিহার সূত্রে জানা যায়, চাইঙ্গা ঠাকুর নামের এক বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু এই বিহারে ১৮০৫ মতান্তরে ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে মহামুনি অর্থাৎ মহামানব গৌতম বুদ্ধের মূর্তি স্থাপিত করেছেন বলে এর নামকরণ করা মহামুনি মন্দির। মহামুনি মন্দিটিকে কেন্দ্র করে মং সার্কেল রাজা কুঞ্জ ধামাই ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে মহামুনি বিহার চত্বরে মেলার প্রবর্তন করেন। যা বাংলা চৈত্র মাসের শেষ তারিখ থেকে শুরু হয়। মহামুনি মন্দির উন্নয়ন ও সংরক্ষণ কমিটির প্রশাসক অনুপম বড়ুয়া বাবুল বলেন, একসময় মহামুনি মেলা এতই জনপ্রিয়তা লাভ করে যে অবিভক্ত বাংলায় পশ্চিমবঙ্গ হতেও এখানে জনসমাগম ঘটেছে।
সুপ্রাচীনকাল হতে মহামুনি বিহার প্রাঙ্গনের বিশাল এলাকাজুড়ে প্রচলিত হয়ে আসা ঐতিহাসিক মহামুনি মেলাটি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী আদিবাসী-বাঙালিদের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। আদিবাসী-বাঙালির এই মিলন মেলাটি মহামুনি মেলা নামে চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে সারাদেশের মধ্যেও পরিচিতি লাভ করেছে। এই মেলায় পার্বত্য রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে কয়েক লাখ আদিবাসীরা এখানে আসেন।
বৃহস্পতিবার(১৩এপ্রিল) সকাল হতে এখানে আদিবাসীরা আসবেন। তারা মহামুনি দিঘিতে স্নান করে পবিত্র হয়ে বিহারে বৌদ্ধপুজা ও সমবেত প্রার্থনা ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিবেন। বিহার প্রাঙ্গণ ও চাইঙ্গা ঠাকুর উদ্যানে তাদের জন্য রাত্রিযাপনের সুব্যবস্থা করা হয়েছে। রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল হারুন বলেন, মেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক পুলিশের অবস্থান থাকবে। এছাড়া সাদা পোশাকে পুলিশের টহল থাকবে। এলাকায় কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হাজার বছরের চিরায়ত বাঙালির ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে প্রতিবারের ন্যায় এবারও চৈত্রসংক্রান্তি ও বর্ষবরণ নানা কর্মসূচী গ্রহণ করেছেন আয়োজকরা।
মেলা পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় ইউপি সদস্য প্রসূন মুৎসুদ্দি বলেন, ১৩ এপ্রিল আদিবাসীদের চৈত্রসংক্রান্তি অনুষ্ঠান শেষে ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে মহামুনি তরুণ সংঘের ব্যবস্থাপনায় মহামুনি বটমূলে (ফনীতটি মঞ্চ) রয়েছে সংগীতানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান, নাটক, মূকাভিনয়সহ ব্যতিক্রমধর্মী মনোজ্ঞ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বর্ষবরণের মহা আয়োজন। এরপূর্ব অনুষ্ঠিত হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা।
এছাড়াও ১৪ এপ্রিল রাতে মহামুনি সাংস্কৃতি সংঘ এবং ১৫ এপ্রিল রাতে মহামুনি তরুণ সংঘের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত হবে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। বর্ষবরণ উৎসব উপলক্ষে মহামুনি তরুণ সংঘ ‘সম্ভবা’ এবং মহামুনি সাংস্কৃতি সংঘ ‘প্রবাহ’ নামে দুটি সাময়িকীর মোড়ক উন্মোচন করেন। ইতোমধ্যে এই মহামুনি মেলাকে ঘিরে মন্দির চত্বরে বিভিন্ন কারুশিল্প, হস্তশিল্প, রকমারি প্রসাধনী, হরেক রকম মিষ্টান্ন দ্রব্যাদি মৌসুমি ফলফলাদি ও খাবার হোটেলসহ রকমারি জিনিসের স্টল নির্মাণ করতে শুরু করেছে বিক্রেতারা। মন্দিরের এই উৎসবকে ঘিরে পাহাড়তলীতে গোটা এলাকাজুড়ে শুরু হয়েছে আনন্দ-উৎসব।

