আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত তিনমাসে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশের কূটনৈতিকরা দাপিয়েছে বাংলাদেশে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত চীনসহ পশ্চিমা বিশ্বের দেশ গুলোর বিশেষ তৎপরতা ছিল লক্ষণীয়। লক্ষ্য আগামী নির্বাচন। তারা সরকার ও বিরোধী পক্ষের নানা লবিংয়ে কথা বলেছেন।দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করতে বেড়েছে তাদের বহুমুখি তৎপরতাও। এবারে সেই কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে ঈদের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই সক্রিয় হচ্ছেন। তিনি জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর করবেন।
নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে চালকের আসনে রয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারই দূরদর্শী নির্দেশনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে বিদেশি হস্তক্ষেপকে স্বাগত না জানিয়ে নির্বাচন ইস্যুতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে সরকারের দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করছে। গত ৬-৯ মার্চ বছরের প্রথম বিদেশ সফরে কাতারে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পঞ্চম জাতিসংঘ সম্মেলনে অংশ নেন সরকার প্রধান। ঈদের পর জাপান এবং সেপ্টেম্বরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সফরের কথা রয়েছে। কূটনৈতিকচ্যানেলে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোতেপ্রধানমন্ত্রীরসফরেরপ্রস্তুতিচলছে। তবেএখনো কোনো সফর চূড়ান্তহয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে,আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক বলিষ্ঠ নেতৃত্ব হিসেবে পরিচিত শেখ হাসিনা। বিচ্ছিন্নতাবাদী, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কারণে তিনি রোলমডেল। ১০ লাখের বেশি মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে মানবতাবাদী নেতা হিসেবে প্রশংসিত হয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার কারণেও তিনি সমাদৃত। তার চৌকস পরিচালনায় ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমান্তরাল সহযোগিতার সম্পর্ক বিরাজ করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে বিদেশি হস্তক্ষেপ বন্ধ করার বিষয়েও তিনি সচেতন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, জাপানের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও করোনার কারণে গত বছরের নভেম্বরে ঢাকা-টোকিও সম্পর্কের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সফরটি স্থগিতহয়। এখন সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছে দুই দেশ। সবকিছু ঠিক থাকলে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে জাপান সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী। এখনো দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। নির্বাচনের আগে সরকার প্রধানের সফর গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।
করোনামহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেরকারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা য়হিমশিম অবস্থায় গত দুবছরে সরকারকে আগামী নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা আন্তর্জাতিক চাপ সামাল দিতে হয়েছে। সম্প্রতিই উরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর কয়েকজন রাষ্ট্রদূত বিএনপির সঙ্গে বৈঠকে বলেছেন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে তারা পর্যবেক্ষক মিশন পাঠাবেনা। এটি হলে অন্য পশ্চিমা দেশগুলোও আগামী নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বিরত থাকতে পারে, যা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। ফলে সরকারও চাইছে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হোক। এদিকে আন্তর্জাতিক চাপ ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাসহ নানা ইস্যুতে যেসব দেশ সরকারের ওপর নাখোশ রয়েছে, সেসব দেশ সফরের সময় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তিনি আলোচনা করবেন বলেও জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগসহ সরকার সমর্থিত দলগুলোর নেতারা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে কূটনীতিকদের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে জানিয়ে দিচ্ছেন, বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। এ দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপ চায়না সরকার। তবে বন্ধু ও উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পরামর্শ স্বাগত জানাবে। বিদেশি কূটনীতিকরাও এখন আর নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে কথা বলছেননা। বরং তারাঅবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক, সহিংসতামুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে গুরুত্ব দিচ্ছেন। যদিও বিএনপি ও সমমনা দলগুলো এখনো নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে অনড় রয়েছে। সম্প্রতি ইইউ ও ভারতের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি নেতারা জানিয়ে দিয়েছেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবেন না তারা। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠককরে পরিষ্কার বলেছে, সংবিধানের বাইরে গিয়ে নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই। তবে বিদেশি কূটনীতি করা চাইছেন, বিভিন্ন দলগুলো রাজনৈতিক সংলাপে নিজেরা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিক।
ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাবিশ্ব, ভারত, চীন, জাপান ও রাশিয়াসহ ক্ষমতাধর দেশগুলো বাংলাদেশকে পাশে রাখতে চায়। দেশের রাজনীতিকদের নির্বাচনী কূটনীতির দৌড় ঝাঁপএবংবিভিন্ন দেশের নানা চাপ ও পাল্টাপাল্টি বাহাস বাংলাদেশের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। এবার স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা বার্তায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার সুস্পষ্ট মনোভাব তুলে ধরেছেন, যা নজির বিহীন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ইতিবাচক মনোভাবকে ধরে রাখাই হবে দূরদর্শী শেখ হাসিনার কূটনৈতিক কৌশল।
এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, করোনা মহামারির পরবর্তী সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘ মহাসচিব গঠিত গ্লোবাল ক্রাইসিস রেসপন্স গ্রুপের ৬ রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের একজন হচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তাই স্বভাবতই তার নেতৃত্বের সরকার এদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে বিদেশি হস্তক্ষেপ চায়না। বন্ধু ও বাণিজ্য সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশ চায়, বিশ্ব সম্প্রদায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে জোরালো ভূমিকা রাখবে, জলবায়ুর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করবে, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে সহযোগিতা করবে।
এদিকে, ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকারের সুসম্পর্ক দিনে দিনে গভীরতর হচ্ছে। জি-২০ সম্মেলনে দেশটির বাংলাদেশে আমন্ত্রণ বার্তা দেয়, গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আজ মর্যাদার সহযোগিতার সম্পর্কে উন্নীত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান স্বাধীনতার বার্তায় যুক্ত করেছেন। দুই শক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে ও চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে বাংলাদেশকে পাশে রাখতে মরিয়া। আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তায় ভারত ও রাশিয়ার অগ্রাধিকার ও বাংলাদেশ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের‘ সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’পররাষ্ট্রনীতিকে শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সরকার কূটনীতিতে চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ভারসাম্য রেখে এগিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের স্বাথের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের স্বার্থ সমুন্নত রাখতে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করেছে।

