জন্মগত প্রতিভায় বিশ্বাসী ছিলেন না বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর। প্রচুর পরিশ্রম করতেন। কাজ করার আগে, ছবি আঁকায় কিংবা লেখার আগে প্রচুর পড়ালেখা করতেন। তাই সবার থেকে তিনি আলাদা। মৃত্যুর পরও তিনি বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। তাঁর সৃষ্টি ও কর্ম নিশ্চয়ই বশীরকে অবিস্মরণীয় করে রাখবে। শিল্পী মুর্তজা বশীর এবং তাঁর সহধর্মিনী আমিনা বশীর স্মরণে আয়োজিত ‘আলট্রামেরিন এওয়ার্ড এক্সিবিশন’ এর সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এমন বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্পী খাজা কাইয়ুম।বিশেষ অতিথি ছিলেন আলট্রামেরিনের পরিচালক, ঢাকা ব্যাংকের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শিল্পী তনয়া মুনিজা বশীর। আরো উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক শিল্পী নাসিমা রুবী, প্রখ্যাত বংশীবাদক ক্যাপ্টেন আজিজুল ইসলাম, প্রাবন্ধিক ও ব্যাংকার কায়েস চৌধুরী।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মৃন্ময় আর্ট গ্যালারির পরিচালক ও ভাস্কর সামিনা এম. করিম। ২০শে আগস্ট শুরু এই প্রদর্শনী গত ১৩ই অক্টোবর সীমিত আকারে একটি সমাপনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শেষ হলো। অনুষ্ঠানে বক্তারা করোনাকালে মৃন্ময় আর্ট গ্যালারীর এই ধরনের আয়োজনকে সাধুবাদ জানান। বক্তারা শিল্পী মুর্তজা বশীর ও তাঁর সহধর্মিনী আমিনা বশীরের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, শিল্পী মুতর্জা বশীর তাঁর চিত্রকর্ম ও বহুমাত্রিক গুণের জন্য অমর হয়ে থাকবেন। শিল্পীর আঁকা বিভিন্ন চিত্রকর্ম দেয়াল, এপিটাফ ফর দ্যা মার্টারাস, জ্যোতি, প্রজাপতির পাখা, কলেমা সিরিজের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
বিশেষ অতিথি মুনিজা বশীর বলেন, ‘আলট্রামেরিন’ তাঁর বাবা শিল্পী মুর্তজা বশীর ও মা আমিনা বশীরের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস, যার মূল উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন জনহিতকর কাজে অংশগ্রহণ করা। আমাদের দেশের শিল্প সংস্কৃতির সমৃদ্ধির জন্য আলট্রামেরিন ভুমিকা রাখবে বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য, আলট্রামেরীন আর্ট এক্সিবিশনের বিচারক ছিলেন প্রথিতযশা শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী এবং শিল্পী জামাল আহমেদ। এই এক্সিবিশনে ছিলো দেশী-বিদেশী বাহান্ন জন শিল্পীর চিত্রকর্ম। এক্সিবিশনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি শিল্পীকে সাটিফিকেট দেয়া হয় এবং বিজয়ী শিল্পীদের দেয়া হয় সাটিফিকেট, ক্রেস্ট ও নগদ পুরস্কার। বেস্ট এওয়ার্ড পেলেন দুই জন, শিল্পী আবদুল্লাহ আল বশির (শিরোনাম – লকডাউন, ৬০দ্ধ ৮৭ সেন্টিমিটার, মিডিয়া – উডকাট) ও শিল্পী আশরাফুল হাসান (শিরোনাম – সবুজের চিতা, ১০৭ দ্ধ ১৩৭ সেন্টিমিটার, মিডিয়া – এক্রেলিক ও চারকোল অন ক্যানভাস)। মৃন্ময় আর্ট গ্যালারীর কর্ণধার সামিনা এম. করিম জানান, কোভিড পরিস্থিতিতেও মৃন্ময় আর্ট গ্যালারি উপুর্যুপরি বেশ কয়েকটি অনলাইন এক্সিবিশন করে চিত্রশিল্পীদের পাশে আছে। সংগ্রাহকগণ বেশ কিছু শিল্পকর্ম সংগ্রহ করেছেন। এ থেকে প্রাপ্ত অর্থ একদিকে যেমন শিল্পীরা পেয়েছেন এবং তেমনি অন্যদিকে কিছু অংশ দিয়ে কোভিড ভিকটিম পরিবারদের সহায়তা করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আলট্রামেরিন এওয়ার্ড এক্সিবিশনে বিক্রয়কৃত শিল্পকর্ম থেকে প্রাপ্ত অর্থের কিছু অংশ কোভিড ভিকটিম পরিবারদের সহায়তায় প্রদান করা হবে।
বহু ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর সন্তান মুর্তজা বশীরের জন্ম ১৯৩২ সালের ১৭ অগাস্ট ঢাকার রমনায়। তিনি ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের জন্য অনেক ড্রইং এঁকেছেন। তাঁর শিল্পকর্মগুলো দেশ ও ভাষার জন্য লড়াই এবং ত্যাগের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ছিলেন। বাংলাদেশে বিমূর্ত বাস্তবতার চিত্রকলার অন্যতম পথিকৃৎ মুর্তজা বশীরের দেয়াল, শহীদ শিরোনাম, পাখা ছাড়াও অসংখ্য উল্লেযোগ্য চিত্রমালা রয়েছে। পেইন্টিং ছাড়াও ম্যুরাল, ছাপচিত্রসহ চিত্রকলার বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি কাজ করেছেন। মুদ্রা ও শিলালিপি নিয়েও তিনি গবেষণা করেছেন। ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘আলট্রামেরিন’। ১৯৮০ সালে তিনি একুশে পদক এবং ২০১৯ সালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সস্মান স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। ২০২০ সালের ১৫ অগাস্ট ৮৭ বছর বয়সে বর্ণাঢ্য জীবনের অসবান ঘটে এই গুণি শিল্পীর। তাঁর জন্ম ও মৃত্যু দিবস স্মরণে ‘আলট্রামেরিন এওয়ার্ড এক্সিবিশন’ এর উদ্যোগ নেয়া হয়।

