১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির গণসমাবেশ নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনৈতিক অঙ্গন। গত ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামে শুরু হওয়া বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের শেষ কর্মস‚চি এটাই। এই সমাবেশ থেকে দলটি ঘোষণা করবে আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রামের রূপরেখা। তেমনটায় বলছেন দলেন দায়িত্বশীল নেতারা। কিন্তু ঢাকার সমাবেশের স্থান নিয়ে জটিলতা কাটছেই না। বিএনপি চায় নয়াপল্টনে তাদের দলীয় কার্যালয় ঘিরে সমাবেশ করতে। সরকার অনুমতি দিয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। অন্য সময় বিএনপি সোহরাওয়ার্দীতেই অনুমতি চায়, সরকার দেয় না। এবার পেয়েও কেন করতে চাইছে না সেটা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
এ প্রসঙ্গে আজ মঙ্গলবার (২৯ নভেম্বর) সচিবালয়ে সমসাময়িক বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তর্থ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদেরএক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বরাদ্দ দেওয়ার পরও বিএনপি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য নয়াপল্টনে সমাবেশ করতে চাইলে সরকার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে ।
এদিকে বিএনপির যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ১০ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে আমরা দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে গণসমাবেশ শেষ করবো। কারণ, সবদিক বিবেচনায় নয়াপল্টন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। সরকার বাধা দিলে বুঝতে হবে তাদের দ‚রভিসন্ধি রয়েছে। আজকে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকার পতনের কোনো বিকল্প নেই।
নয়াপল্টনের সমাবেশ করা নিয়ে দলের নেতাদের সাথে কথা হলে বিএনপির নেতারা তুলে ধরছেন নানান যুক্তি। সড়ক বন্ধ থাকলে যানজটের প্রসঙ্গ এলে তারা বলছেন শনিবার ছুটির কথা। তুলে ধরছেন ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে আসা নেতাকর্মীদের বিভিন্ন সুবিধার কথাও। অপরদিকে সরকারের পক্ষ থেকে কড়া হুঁশিয়ারি, আন্দোলন-সমাবেশে সমস্যা নেই, হামলা হলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
নয়াপল্টনে করলে লাভ কী আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে করলে ক্ষতিই বা কী? নয়াপল্টনে কর্মস‚চি পালন করলে সড়ক বন্ধ থাকবে। এতে জনদুর্ভোগ বাড়বে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ ¯েøাগানকে বলেন, এখানে জেদাজেদির কিছু নেই, লাভ-ক্ষতির কিছু নেই। শনিবার ছুটির দিন। সব অফিস বন্ধ। নেতাকর্মীরা রিল্যাক্স মুডে সমাবেশে অংশ নিতে পারবেন। আশেপাশে হোটেল-রেস্টুরেন্ট আছে প্রয়োজনীয় খাবার খেয়ে নিতে পারবেন। আমরা এখানে কর্মস‚চি পালন করতে অভ্যস্ত।
‘এখানে যেসব পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন তারাও অভিজ্ঞ। কীভাবে কাকে ডিল করতে হবে তারা জানেন। সব মিলিয়ে নয়াপল্টন আমরা চেয়েছি। আশা করি নয়াপল্টনে সমাবেশ করতে পারবো। এটা আমাদের বিভাগীয় কর্মস‚চি। কাজেই নয়াপল্টনে নেতাকর্মীরা যে সুবিধা পাবেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সেই সুবিধা পাবেন না।’
বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও মিডিয়া সেলের সদস্য সচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ‘বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি চায়নি। আমরা নয়াপল্টনের জন্য অনুমতি চেয়েছি।’
নয়াপল্টনে অনুমতি চেয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাওয়ায় অবাক বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান। তিনি বলেন, ‘সরকার সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশের অনুমতির কথা বললেও আমরা আগের অবস্থানেই আছি। আমাদের তো কোনোদিনই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দেয় না, কিন্তু হঠাৎ করে আমাদের সমাবেশের অনুমতি দেওয়ায় অবাক লাগছে। আমাদের ভেন্যু পার্টি অফিসের সামনে। এটা আমাদের জন্য সুবিধা হয়, সেজন্য আমরা চেয়েছি।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল যে পল্টনে মিটিং করেন কোনো সমস্যা নেই। এখন যদি কোনো কারণে বাধা আসে তাহলে সেটার কারণ বোধগম্য নয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনেক কিছু তৈরি হয়েছে। সেখানে আসলে তেমন কোনো মাঠ নেই।’
বিএনপির শরিক দলের নেতারা মনে করেন নয়াপল্টনে সমাবেশ করলে সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারবে বিএনপি। সরকারের এতে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয় বলেও মনে করেন তারা।
বাংলাদেশ লেবার পাটির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, নয়াপল্টনে সমাবেশে বিএনপির লাভ-লস তারা বলতে পারবে। কিন্তু আমি বলছি, নয়পল্টনে করলে সরকারের সমস্যা কী?
‘নয়পল্টনে তাদের অফিসের সামনে লম্বা বড় রাস্তা, কাকরাইল থেকে মতিঝিল পর্যন্ত। নেতাকর্মীরা ভালোভাবে অংশ নিতে পারবেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আগের সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নেই। জায়গা খুব ছোট হয়ে গেছে। নয়পল্টনে প্রতিদিনই কর্মস‚চি পালন করা হয়।’
১০ ডিসেম্বরের বিভাগীয় গণসমাবেশ নিয়ে বিএনপি ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ভ‚মিকায় রয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক অভিজ্ঞরা। তাদের মতে, বিএনপি বলছে লাখ লাখ লোক আনবে। লাখ লাখ লোকের জায়গা দিতে হলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বেস্ট। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও এখানে সমাবেশ করেছেন। নয়াপল্টনে রাস্তায় কয়েক হাজার লোক ধরবে? বিএনপি এতদিন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছে যে তাদের সমাবেশের জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুমতি দেওয়া হয় না, যে কারণে তারা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এবং নয়াপল্টনে তাদের দলীয় কার্যালয়ের সামনে কর্মস‚চি পালন করে। ভবিষ্যতে মহাসমাবেশের জন্য সরকার যদি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপিকে অনুমতি না দেয়?
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মহিউদ্দিন মোহন বলেন, ম‚লত বিএনপি লোকসমাগম দেখানোর জন্য সমাবেশ করতে চায়। নয়াপল্টনের রাস্তায় একলাখ লোক জড়ো হলে সেটাকে জনাকীর্ণ জনসমাবেশ দেখানো যায়। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একলাখ মানুষ জড়ো হলে তা এক কোণায় পড়ে থাকে। নয়াপল্টনে সমাবেশ করা নিয়ে বিএনপির দ‚রভিসন্ধি রয়েছে।
এদিকে সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রি ড. হাসান মাহমুদ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আজ মঙ্গলবার দুপুরে বলেছেন, বলেন, ‘তাদের (বিএনপি) সমাবেশ করার সুবিধার কথা ভেবেই সরকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বরাদ্দ দিয়েছে। তারা যেই সমাবেশ করার কথা বলেছে, ১০ লাখ মানুষ জড়ো হবে। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীতে ১০ লাখ মানুষ ধরার জায়গা নেই। কিন্তু ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় মাঠ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। তারা যে ধরনের সমাবেশ করতে চায় সেক্ষেত্রে প‚র্বাচলের বাণিজ্য মেলার মাঠ ছাড়া আর কোনো জায়গা নেই।’
‘তারপরও সরকার সৎ উদ্দেশ্যে তাদের সমাবেশ করার সুবিধার্থে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বরাদ্দ দিয়েছে। কারণ নয়াপল্টনের সামনে ৩০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ জড়ো হতে পারবে। কিন্তু তারা যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে নয়াপল্টনে সমাবেশ করতে চায়, তাহলে সরকার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।’

