ফেনী জেলা কারাগারে থাকা স্ত্রী মিতু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের কক্ষে তল্লাশি চালানোর বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন ফেনী সদর মডেল থানার ওসি মো. নিজাম উদ্দিন।
তিনি বলেন, “বাবুল স্যার ফেনী কারাগারে সেটিই আমি জানতাম না। রবিবার গণমাধ্যমে খবর আসার পর বাবুল আকতার স্যার ফেনী কারাগারে থাকার বিষয়টি জানতে পারি। আইনগতভাবে পুলিশের কোন কর্মকর্তাই আদালতের অনুমতি ছাড়া কারাগারে কোন আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন না। ডাকাতি মামলার একজন আসামীর খোঁজ নিতে গিয়ে জেল খানায় গিয়েছি। জেল সুপার মহোদয়ের রুমে মাত্র ৫-৬ মিনিট ছিলাম। জেল খানা পুরোটাই সিসিটিভির আওতায় থাকে। ভেতরে বাইরে সিসিটিভি রয়েছে। কারাগারের ওয়ার্ডের বাইরেও সিসিটিভি রয়েছে। এসব সিসিটিভির ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই তো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।’
ফেনী সদর থানার ওসি বলেন, আমাদের আশেপাশে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ডাকাতের আনাগোনা বেড়েছে। ডাকাতি প্রতিরোধ এবং নির্মূলের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে একটি ডাকাতি মামলার আসামীর তথ্য নেওয়ার জন্য কারাগারে গিয়েছিলাম। ফেনী এলাকার একজন ডাকাতের বিষয়ে তথ্য জানতে। ওই ডাকাত আগে গ্রেফতার হয়ে কারগারে গিয়েছিল। সেই জামিনে বেরিয়ে গেলে নাকি, কারাগারে আছে, সেটি নিশ্চিত হওয়ার জন্যই কারাগারে গিয়েছিলাম। তাছাড়া বাবুল স্যারের ফেনী রিলেটেড কোন কার্যক্রমও ছিল না- জানালেন ওসি।
এদিকে ফেনী সদর থানার ওসি নিজাম উদ্দিন জেলা কারাগারে আটক থাকা সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের কক্ষে তল্লাশি চালিয়েছেন- এমন অভিযোগে সোমবার চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে একটি নালিশী আবেদন করেছেন বাবুল আকতারের আইনজীবী গোলাম মওলা মুরাদ। চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ বেগম জেবুন্নেছার আদালতে করা ওই আবেদনে উল্লেখ করা হয় গত ১০ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় জেল কোডের বিধান অমান্য করে ফেনী মডেল থাানার ওসি নিজাম উদ্দিন বাবুল আক্তারের কক্ষে তল্লাশি চালিয়েছেন। বাবুল আকতারের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ফেনী জেলা কারাগারের জেল সুপারকে নির্দেশনা দিতে আদালতের কাছে নির্দেশনা চাওয়া হয়।
মামলার আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাবুল আক্তারকে রিমান্ডে এনে নির্যাতনের অভিযোগে পিবিআই প্রধানসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর বিবাদীরা মারমুখী হয়ে উঠেন। ওই ৬ জনের প্ররোচনায় এবং নির্দেশে ফেনী মডেল থানার ওসি নিজাম উদ্দিন জেল কোডের বিধান তোয়াক্কা না করে ফেনী কারাগারে প্রবেশ করে বাবুল আক্তারের কক্ষে দীর্ঘ সময় তল্লাশির নামে তার জবেনের ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করেন। কারাগারে তার প্রবেশের চিত্র সিসিটিভির ক্যামেরা যাচাই করলেই নিশ্চিত হওযা যাবে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়। জেল কোড অনুসারে থানার কোন কর্মকর্তা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং আদালতের লিখিত অনুমতি ছাড়া কারাগারে প্রবেশ করতে পারেন না বলে আবেদনের উল্লেখ করেন তার আইনজীবী।
বাবুল আক্তারের আইনজীবী গোলাম মওলা মুরাদ বলেন, পিবিআই প্রধানসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলার আবেদন করার পর বাবুল আক্তারকে মানসিক চাপে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিবাদীরা। আদালত এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কোন লিখিত অনুমতি ব্যতিরেখে কারাগারের অভ্যন্তরে একজন পুলিশ কর্মকর্তা প্রবেশ করে একজন হাজতির কক্ষে তল্লাশি চালানো বিস্ময়কর। পুরো বিষয়টিতে ফেনী জেলা কারাগারের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে ঘটনা সম্পর্কে জানা সহজ। আদালতের অনুমতি ব্যতিরেখে একজন হাজতি আসামীর কক্ষে প্রবেশ করা জেল কোড অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমরা আদালতকে বিষয়টি জানিয়েছি। এখন আদেশ দেননি। আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
এর আগে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ এনে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান বনজ কুমার মজুমদারসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে গত ৮ সেপ্টেম্বর একই আদালতে আরেকটি মামলার আবেদন করেন সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার। এ বিষয়ে আদেশের জন্য আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত। ও্ই মামলার আবেদনে পিবিআই চট্টগ্রাম জেলার এসপি মো. নাজমুল হাসান, মেট্রো এসপি নাঈমা সুলতানা, খুলশী থানার ওসি সন্তোষ কুমার চাকমা, সিএমপির ডিবি বন্দর জোনের সহকারী কমিশনার একেএম মহিউদ্দিন সেলিম ও পিবিআই চট্টগ্রাম জেলার ইন্সপেক্টর কাজী এনায়েত কবিরকে আসামী করা হয়েছে। মামলায় নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর ১৫(১) ধারা এবং সংশ্লিষ্ট আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ করা হয়।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরের নিজাম রোডে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে দুর্বৃত্তদের গুলি ও ছুরিকাঘাতে খুন হন বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু। ওই সময় এ ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচিত হয়। ঘটনার সময় মিতুর স্বামী তৎকালীন পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার অবস্থান করছিলেন ঢাকায়। ঘটনার পর চট্টগ্রামে ফিরে তিনি পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন।
পরে বাবুল আক্তারের দায়ের করা মামলায় স্ত্রী হত্যাকাণ্ডে তারই সম্পৃক্ততা পায় পিবিআই। এরপর গত বছরের ১২ মে আগের মামলায় চ‚ড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন বাবুল আক্তারকে প্রধান আসামি করে চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানায় আরেকটি মামলা করেন মিতুর বাবা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ পরিদর্শক মোশাররফ হোসেন। ওইদিনই মামলাটিতে বাবুল আক্তারকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় পিবিআই। সেই থেকে কারাগারে আছেন তিনি। মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই।

