কারাগার স্থানান্তরসহ সরকারি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে সরকারি পাহাড় দখল করে গড়ে তোলা অবৈধ বসতি ও স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। এক মাসের মধ্যেই সলিমপুরকে অবৈধ দখলমুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রহমান। এদিকে জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে জেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত এ অভিযান চালানো হয়।
অভিযানে ১৭৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রায় ৭০০ একর জায়গা উদ্ধার করা হয়। অভিযানে নেতৃত্বে দেন জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রহমান। অভিযানে আলীনগরে সরকারি জমিতে সন্ত্রাসী ইয়াসিনের অফিস, ঘর ও তার বিশেষ টর্চার সেল গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। উদ্ধারকৃত জায়গায় জঙ্গল সলিমপুরে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের আওতায় বিভাগীয় পাহাড় ব্যবস্থাপনা অফিস; চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার স্পোর্টস ভিলেজ, সাফারি ও ইকোপার্ক, র্যাব ও পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
অভিযানে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক, সীতাকুণ্ড উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আল মামুন, জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার উপ-পরিচালক বদিউল আলম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ নাজমুল আহসান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এল এ) মাসুদ কামাল, সীতাকুÐ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শাহাদাত হোসেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আশরাফুল আলম, নেজারত ডেপুটি কালেক্টর মো. তৌহিদুল ইসলাম, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নু এ মং মারমা এবং তানভীর চৌধুরী, সীতাকুÐ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুল করিম, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে প্রথমদিনেই উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এ সময় কয়েক’শ বাসিন্দা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এক পর্যায়ে তারা সড়ক অবরোধ করে উচ্ছেদকারীদের অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়।
চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট-বায়েজিদ সংযোগ সড়ক থেকে আনুমানিক তিন কিলোমিটার ভেতরে আলীনগর পাহাড়ে বিকেল তিনটা থেকে অভিযান শুরু হয়। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অভিযানে র্যাব-পুলিশ-আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ২০০ সদস্য জেলা প্রশাসনের কর্মীদের সঙ্গে অংশ নেন।
সীতাকুণ্ড উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আশরাফুল আলম জানান, আলীনগরে চারটি পাহাড়ে একযোগে অভিযান চালিয়ে শতাধিক স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই পাহাড় ও জঙ্গল কেটে গড়ে তোলা বসতঘর। ইয়াসিন নামে এক ভূমিদস্যুর আস্তানা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুমন বণিক বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকৃত যারা ভূমিহীন তাদের পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হয়। এরপর আমরা তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিয়েছি। এখন পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।’
এর আগে, গত ২২ জুলাই আলীনগরে প্রথম দফা অভিযান চালিয়ে পাহাড় কাটার সময় তিনটি স্কেবেটর ও ছয়টি ট্রাক জব্দ করা হয়। এরপর মঙ্গলবার প্রথম উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে।
সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ী এলাকা জঙ্গল সলিমপুর পাহাড়ে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাসজমি আছে। ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন সেই খাসজমি দখল করে প্রায় তিন দশক ধরে সেখানে পাহাড় কেটে ও জঙ্গল সাফ করে প্লট বিক্রি করে আসছে। নিম্ন আয়ের লোকজন সেই প্লট কিনে সেখানে বসতি ও দোকানপাট গড়ে তুলেছে, যার মধ্যে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাও আছে। জেলা প্রশাসন বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও সেখান থেকে তাদের সরাতে পারেনি। সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী ওই এলাকায় প্রায় ১৯ হাজার মানুষ বসবাস করে। এ অবস্থায় জেলা প্রশাসন সম্প্রতি সেই খাস জমি দখলমুক্ত করে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরির মহাপরিকল্পনা নেয়। গত ১ জুলাই তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ পরিদর্শনে গিয়ে নগরীর লালদিঘী এলাকা থেকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার সলিমপুরে স্থানান্তরের ঘোষণা দেন। সেখানে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র, আর্মি স্টেডিয়াম, হাসপাতাল, পার্কসহ সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা জানান তথ্যমন্ত্রী।
অন্যদিকে, জেলা প্রশাসক জঙ্গল সলিমপুরে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ‘নাইট সাফারি পার্ক’, স্পোর্টস ভিলেজ, ক্রিকেট স্টেডিয়াম, আইকনিক মসজিদ, ইকো পার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনা করার পরিকল্পনার কথা জানান।
মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে উচ্ছেদ অভিযান শুরুর পর জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে ৩১০০ একর সরকারি খাস পাহাড়ি জমি আছে। সেখান থেকে আমরা অবৈধ দখলদারদের সরাতে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছি। সরকারি ভূমি অবৈধ দখলমুক্ত করা হবে। মঙ্গলবার আমরা শতাধিক দোকান ও বসতঘর উচ্ছেদ করেছি।
অভিযান চলমান থাকবে। এখানে নতুন করে আর কোনো বসতি স্থাপন করতে দেওয়া হবে না। নতুন করে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগও দেওয়া হবে না। এক মাসের মধ্যে সমস্ত অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা করে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।’
পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক বলেন, ‘সলিমপুরে সরকারি জমি দখল করে ও পাহাড় কেটে যারা অপরাধীদের অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। এখানে সরকারি বিভিন্ন দফতর স্থাপনের মহাপরিকল্পনা নিয়েছে জেলা প্রশাসন। আমরা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব। এখানে একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প ও একটি র্যাবের ক্যাম্প করা হবে। জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন চূড়ান্তভাবে জায়গা বুঝিয়ে দিলে ক্যাম্প স্থাপনের কাজ শুরু হবে।’

