দৈনিক আজাদী’র প্রয়াত সম্পাদক বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের জন্মশত বার্ষিকীতে তার কর্মকৃতি নিয়ে স্মৃতি আলোচনা করেছেন চট্টগ্রামের পাঁচ একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তি। পাঁচ গুণীজন হলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমাজ বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. অনুপম সেন, প্রথিতযশা সাংবাদিক অধ্যাপক আবুল মোমেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যপক ড. মাহবুবুল হক, পদার্থবিদ ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া, দৈনিক আজাদী’র সম্পাদক এমএ মালেক।
বুধবার ৬ জুলাই সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে চট্টগ্রাম একাডেমির উদ্যোগে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত শিশুকিশোর চিত্রাংকন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের এই পাঁচ গুণী ব্যক্তি অধ্যাপক মোহম্মদ খালেদের কর্মকৃতি নিয়ে স্মৃতি আলোচনা উপস্থাপন করেছেন।

সভায় সভাপতির বক্তব্যে ড. অনুপম সেন বলেন, প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তিরা তাদের জীবনাচরণে, আচার আচরণে, বিনয়- ভদ্রতায় সমাজের কাছে নিজেকেতুলে ধরেন। সমাজ তাদেরকে অনুসরণ করে আলোকি তহয়। অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ ছিলেন এমনই একজন। বয়সে, প্রজ্ঞায়, অভিজ্ঞতায় প্রায় ২০ বছরের ছোট হলেও তিনিআমাকে ‘স্যার’ এবং‘ আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন। এজন্য তাঁকে অনেক বার অনুরোধ করেছি। কিন্তু তিনি আমাকে ঐ স্যার বলেই সম্বোধন করতেন। পরে অনুভব করেছিলাম তিনি ব্যক্তি অনুপম সেনকে স্যার বলে সম্বোধন করছেন না। তিনি একজন শিক্ষক অনুপম সেনকে স্যার বলে সম্বোধন করেছেন। অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ একাধারে একজন রাজনীতিবিদ, একজন পত্রিকার সম্পাদক, একজন শিক্ষক। তবে এতগুলো গুণের সমন্বয় থাকা সত্তে¡ও তিনি ছিলেনবিনয়ী সহজ সরল সদালাপী একেবারে সাদামাটা জীবনা চরণকারী একজন ব্যক্তিত্ব। সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতিতে তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই চট্টগ্রামের অভিভাবক।

সভায় অধ্যাপক আবুল মোমেন বলেন, আজকের দিনের সংসদ সদস্যদের দেখা যায় সবাই ব্যবসা বাণিজ্য বা বিভিন্ন কাজে ঢাকায় থাকেন। কিন্তু অধ্যাপক মো. খালেদ সাহেবদের সময় অন্যরকম। তিনি ৭০’র নির্বাচনে দোর্দন্ড প্রতাপশালী ফজলুল কাদের চৌধুরীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি থাকতেন চট্টগ্রামে। সেসময় সৈয়দ নজরুল ইসলাম বা ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর মতো অনেক সংসদ সদস্যই স্ব স্ব এলাকায় থাকতেন। তিনি নিজেকে কখনো জাহির করতেন না। নিজের অবস্থানের মধ্যে থেকে সমাজ দেশ জাতির জন্য কিছু করার প্রত্যয় নিয়ে সর্বদা কাজ করতেন অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ। আজকের ক্ষয়িষ্ণু সমাজকে মেরামত করতে হলে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের আদর্শকে জাগরূক করে তুলতে হবে।
সভায় ড. মাহবুবুল হক বলেন, আজাদী’তে বিভিন্নভাবে জড়িত থাকার সুবাদে অধ্যাপক মো. খালেদের স্নেহপরশ লাভের আমার সুযোগ হয়েছিল। তার স্নেহধন্য পরামর্শ আমার পথ চলার পাথেয় হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি রাজনীতিবিদ ছিলেন কিন্তু তিনি উদার নৈতিক ব্যক্তি ছিলেন। দৈনিক আজাদী’র ৩৫ বছরপূর্তিতে অধ্যাপক মো. খালেদের নেতৃত্বেই আমরা “হাজার বছরের চট্টগ্রাম” বের করেছিলাম। তার হাত ধরে আজ অনেকেই লেখক হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন লেখক গড়ার কারিগর।
ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়–য়া স্মৃতি আলোচনায় বলেন, একজন প্রকৃত বাঙালির তিনটি গুণ থাকা চাই। বাঙালি জাতীয়তাবোধে বিশ^াসী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে বিশ্বাসী এবং সর্বোপরি অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধে ধার্মিক ব্যক্তি। অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের এই তিনটি গুণেই গুণান্বিত ছিলেন। আমরা দৈনিক আজাদীতে যা লেখাই পাঠাতাম তিনি তা ছাপিয়ে দিতেন। তিনি বলতেন- লেখা পাঠান, বাকিটা আমি দেখব। আমাদের লেখার শক্তি, সাহসের যোগানদাতা হিসেবে তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের অভিভাবক।

স্মৃতি আলোচনায় এমএ মালেক বলেন, হুমায়ুন আহমেদ একটা কথা বলেছেন, সাধারণের মতো বেঁচে থাকাই অসাধারণ কাজ। অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ অসাধারণ হয়েও সাধারণের মতো জীবনযাপন করতেন। প্রত্যেক দেশ ও জাতিতে কিছু ক্ষণজন্মা পুরুষ জন্ম নেয়। অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ ছিলেন আমাদের ক্ষণজন্মাপুরুষ। তিনি মানুষকে কথা দিয়ে কখনো কথার বরখেলাপ করেননি। এক বার গায়ে ১০৪ ডিগ্রি জ¦র নিয়ে তিনি চলে যান বাঁশখালীতে একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। কারণ ঐ অনুষ্ঠানে যাবেন বলে তিনি তাদেরকে কথা দিয়েছিলেন। আমাদের অনুনয়-অনুরোধ সত্তে¡ও তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। এই হলো অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ। সম্পর্কে তিনি আমার ভগ্নিপতি। আমার বাবার আকষ্মিক মৃত্যুর পর তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন দৈনিক আজাদী’র।

অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে ১ জুলাই অনুষ্ঠিত চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম একাডেমির পরিচালক ড. আনোয়ারা আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমির মহাপরিচালক আমিনুর রশিদ কাদেরী। বক্তব্য দেন সাবেক মহাপরিচালক নেছার আহমেদ, পরিচালক এসএম আবদুল আজিজ, অধ্যাপক কাঞ্চনা চক্রবর্তী, অধ্যাপক গোফরান উদ্দিন টিটু, চট্টগ্রাম একাডেমির পরিচালক দীপক বড়ুয়া, চারুকলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ রীতা দত্ত, সাংবাদিক গল্পকার বিপুল বড়ুয়া, প্রাবন্ধিক রেজাউল করিম স্বপন, চট্টগ্রাম একাডেমির পরিচালক এসএম মোখলেসুর রহমান। লেখাপাঠে অংশ নেন ছড়াকার উৎপলকান্তি বড়ুয়া, ছড়াকার জসিম মেহবুব, ছড়াকার সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার, কবি সৈয়দা সেলিনা আক্তার প্রমুখ।

