অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ-এর সাথে আমার পরিচয় ১৯৭১ থেকে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি দেশের স্বাধীনতার প্রয়োজনে চলে যান ভারতে। তখন তিনি এমএনএ, দেশে থাকা তার জন্য নিরাপদ ছিল না। পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে ধরতে পারলে তাদের স্বার্থে তাকে ব্যবহারের চেষ্টা করত।অনেককে তারা তাদের মতো করে ব্যবহার করেছে। যাক সে কথা। যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলো, প্রফেসর খালেদ সাহেব দেশে ফিরলেন। আমার সাথে প্রথম দেখাই জিজ্ঞেস করলেন, কেমন ছিলেন? খুব বেশি অসুবিধা হয়নিতো? জানতে চাইলাম, আপনি কেমন ছিলেন ? উত্তরে তিনি বললেন,স্বাধীনতার জন্য অন্য দেশে ছিলাম সত্যি, কিন্তু আমাদের নিরাপত্তা ছিল। আপনারা যারা দেশে ছিলেন তাদেরতো নিরাপত্তা ছিল না। আপনারা তো প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যে ছিলেন। এই যে আমাদের সম্বন্ধে অনুধাবন তা ক’জনই করেছেন? যুদ্ধের সময় আমাদের কী কষ্ট হয়েছে তা প্রফেসর খালেদ অনুধাবন করেছেন। অনেকেই তা করেননি।বরং তারা তাদের ব্যবহারে এমন ভাব দেখিয়েছেন যেন দেশে থেকে আমরা মহা অন্যায় করে ফেলেছি।
প্রফেসর খালেদ হৃদয়বান ও অমায়িক ছিলেন। যুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশে এবং এই শহরে আমরা অনেক কাজ করেছি। এক সাথে কাজ করতে গিয়ে তাকে আরো গভীরভাবে চেনার সুযোগ হয়েছে। একই সময়ে অনেক সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দিয়েছি। স্বল্পভাষী এই মানুষটি সুন্দর গুছিয়ে অল্পতেই অনেক কথা প্রকাশ করেন, সুচিন্তিতভাবে বলেন। বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো, যা বলেন, নির্ভয়ে বলেন। তার বলার মৌলিকত্ব হলো সংযত হয়ে বলার বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ষ্টাইল। স্পষ্ট এবং সত্য বলা তার অভ্যাস। দেশ, সমাজ ও চলমান জীবন নিয়ে ভাবেন বলেই তিনি বক্তৃতা বিবৃতিতে সুক্ষ্ম সত্য কথা অবলীলায় বলতে পারেন। এসব কারণে তিনি একটি প্রতিষ্ঠান বা ইনষ্টিটিউশনে পরিণত হতে পেরেছেন।
পরমতসহিষ্ণুতা তাঁর একটি অন্যতম বড় গুণ। এই গুণের অভাব এখন আমাদের মাঝে প্রকট। আমাদের অনেকেই ধারণা আমরা যা বলছি তাই ঠিক, কিন্তু আমাদের মত ও বিশ্বসের বাইরে যে আরো মত থাকতে পারে, শিক্ষণীয় বিষয় থাকতে পারে তা অনেকেই বিশ্বাস করতে চায় না। কিন্তু খালেদ সাহেব সে গুণের অধিকারী। তিনি নিজের মত স্পষ্ট করে প্রকাশ করেন এবং অন্যের মতাতকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেন, সম্মান করেন। দীর্ঘ দিন তার সাথে মিলে মিশে সত্য উপলব্ধি করেছি। তিনি সমস্ত গতানুগতিকতার ঊর্ধ্বে।অন্ধের মতো কিছুই বিশ্বাস করেন না। যা বিশ্বাস করেন জেনে শুনেই বিশ্বাস করেন। এবং নিজের বিশ্বাসকে খুব সহজ সরলভাবে যুক্তি দিয়ে প্রকাশ করেন। বিশ্বাসের বাইওে তাকে টেনে নেওয়া যায় না-এটাই তার অন্যতম প্রধানগুণ।
তার প্রচুর পড়ালেখা আছে বলেই তিনি সব পরিস্থিতিতে এবং বিষয় আলোচনায় নিজের মতামত পেশ করতে পারেন। তার কথা শুনলে স্পষ্টই বোঝা যায় তিনি অতীতে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন এবং এখনো করছেন। প্রচুর পড়াশোনা না থাকলে এমন স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন, যুক্তি দিয়ে বিষয়টিকে সহজ ও সাবলিল করে উপস্থাপন করতে পারতেন না। প্রচুর পড়ালেখা আছে বলে তিনি অথরিটি নিয়ে কথা বলতে পারেন। তার নিজস্ব মত কতটা জোরদার সে প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা বলছি, একবার তিনি শিবিরের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গেছেন প্রধান অতিথি হয়ে। জামায়াত-শিবির কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন তার মুখ দিয়ে তাদের পক্ষে কথা বলাবেন। কিন্তু তিনি তাদের সভায় দাঁড়িয়ে নিজের মত প্রকাশ করেছেন, ধর্মের নামে যারা ব্যবসা করেন, ধর্মের নামে যারা অপরাজনীতি করেন সে কথাগুলো কত জোরালো কণ্ঠে বলেছিলেন,তা যারা শুনেছেন তারা সকলে বিষ্মিত হয়েছেন। অনেকে এর জন্য তার সমালোচনা করেছেন। কিন্তু তাদের সভায় তিনি কি বলেছেন তা তো তারা বিশ্লেষণ করেননি। এ প্রসঙ্গে প্রফেসর খালেদকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমরা আমাদের মতো আমাদের ফোরামে আলোচনা করি। কিন্তু তাদের ফোরামে দাঁড়িয়ে যদি আমাদের মত প্রকাশ করি তাতে অসুবিধে কোথায়? তাদের ফোরামে দাঁড়িয়ে আমাদের মতকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা যেত তাহলে তাদের মাঝে অনেকে আছেন যারা যুক্তিতে বিশ্বাস করেন। তাহলে তারা ধর্মের নামে রাজনীতির পথ থেকে সরে আসতেন। সে দিনের সভায় তার বক্তব্যের সময় আয়োজকরা বিক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এবং তাদের অনেক পরে তার বক্তব্যের প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ তিনি সে সভায় ইসলামের প্রকৃত আদর্শ তুলে ধরেছিলেন। জামাত-শিবিরের দুর্গে দাঁড়িয়ে এমন সত্য উচ্চারণ কজনই করতে পারবেন বলুন?
তিনি পরীক্ষিত মানুষ। ক্ষমতায় থেকেও দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি থেকে তিনি দূরে ছিলেন। সুযোগ থাকার পরও তিনি তা করেননি। তাই কোন মহলই তার বিরুদ্ধে অন্যায়ের কোন চার্জ আনতে পারেননি। এমনকি কেউ সমালোচনাও করেন নি। কারণ ক্ষমতায় থাকার সময়ও তিনি স্ফটিকের মতোই স্বচ্ছ ছিলেন। তাই কি পরীক্ষিত পরশপাথর। ক্ষমতায় থেকে এবং সুযোগ থাকার পরও যিনি শুদ্ধ ছিলেন, তিনি প্রকৃতই সৎ মানুষ। একদিকে একটি প্রসিদ্ধ পত্রিকার সম্পাদক, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশ। এত সুযোগ তারপরও তিনি শুদ্ধ থেকেছেন। এটাই তাকে মহৎ মানুষের কাতারে এনেছে। তিনি ছিলেন খুব সাহসী।
আমি যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং একটি ছাত্র সংগঠন আমাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে তখন খালেদ সাহেব জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাকে দেখতে গেছেন। কতটা সহমর্মিতা ও স্নেহের পরশ থাকলে তিনি যেতে পারেন। সে সময় তার সমূহ বিপদ হতে পারত, লাঞ্ছনার শিকার হতে পারতেন।
নীতি ও নৈতিকতার আদলে তিনি এনলাইটেড পলিটিক্স করেছেন। এখন মনে করছেন নীতিবানদের জন্য রাজনীতি নেই। বদলে গেছে রাজনীতির অঙ্গন। এখন চলছে কম্প্রোমাইজিং পলিটিক্স, তাই তিনি দূরে সরে এসেছেন। রাজনীতি থেকে সরে এলেও তিনি দেশ জন্য জ্ঞান ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন অনবরত, অবিরত। তিনি দেশের জন্য প্রচুর ত্যাগ করেছেন। কিন্তু এখনো রাষ্ট্র তাঁকে তেমন কিছু দেইনি। তিনি স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন। রাষ্ট্র তাঁকে এ সবে সম্মানিত করলে জনগণের শ্রদ্ধা ও প্রশংসা অর্জন করতে পারত। তিনি দেশে আদর্শের একটি মডেল। দেশসেবা, সমাজসেবা, সাংবাদিকতা সব ক্ষেত্রেই তিনি একজন অনুকরণীয় মানুষ।
ইমা

