চট্টগ্রামের রাউজানে মাটি কাটাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বের জেরে দূর্বৃত্তের গুলিতে নিহত মুহাম্মদ কাউসার উজ জামান বাবলু (৩৬) নামের এক যুবক খুন হয়েছে। এই ঘটনায় মরদেহ নিয়ে চট্টগ্রাম -রাঙ্গামাটি মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে গ্রামবাসী । পরে উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনী নিহতের শিশু দুই কন্যার ভরনপোষণ ও খুনিদের গ্রেপ্তার ২৪ ঘন্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিলে প্রায় দুই ঘটনা পর অবরোধ ছেড়ে দেয় গ্রামবাসী।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) বেলা আড়াইটা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে চৌধুরী মার্কেট এলাকায় চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়কের একপাশে মরদেহবাহী অ্যম্বুলেন্স ও মরদেহ বহনকারী খাট আড়াআড়ি করে রেখে এবং দুইপাশে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে, টুল-টেবিল, খাট, গাছের গুঁড়ি দিয়ে সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সড়কের উপর অবস্থান নেন। গ্রামের কয়েকশ নারী-পুরুষ। এই সময় সড়কের উভয়পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। তীব্র গরমে গাড়ির মধ্যে যাত্রীদের হাসফাস করতে দেখা যায়। চরম যাত্রী দূর্ভোগ সৃষ্টি হয়। অবরোধের ঘন্টাখানেক পর ঘটনাস্থলে পুলিশ আসেন। পরে রাউজান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক অংচিং মারমা, থানার অফিসার ইনচার্জ সাজেদুল ইসলাম পলাশ ওস্থানীয় সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীর প্রতিনিধি হিসেবে উত্তর জেলা যুবদলের সহ সভাপতি সাবের সুলতান কাজল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে নিহতের স্বজন ও গ্রামবাসীদের।দাবীর প্রেক্ষিতে আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তার ও তার সন্তান ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিলে গ্রামবাসীরা অবরোধ তুলে নেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এরপূর্বে শনিবার (২৫এপ্রিল) ভোর আনুমানিক ৩ টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব আইলীখীল এলাকার আলী আহমেদ প্রকাশ ননাইয়ের টিলায় একটি মাটি খননযন্ত্রের (ভেকু) পাশে বাবলু গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে গহিরা জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে ভোর ৫টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসার সময় নিজ এলাকায় ফিরলে মরদেহ নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন গ্রামবাসী। নিহত বাবলু একই ওয়ার্ডের ঢালার মুখ এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম সওদাগরের ছেলে।
তিনি স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তান রেখে গেছেন। তাকে স্থানীয় বিএনপির সভা-সমাবেশে দেখা গেলেও তার কোন রাজনৈতিক পদ-পদবী নেই। এই বিষয়ে উত্তর জেলা যুবদলের সহ সভাপতি সাবের সুলতান কাজল বলেন, তিনি দলের কেউ নন। তবে তিনি সমর্থক হতে পারে। তবে, এই হত্যাকান্ডের নিন্দা জানাচ্ছি। অতীতের হত্যাকান্ডের বিচারহীনতার কারণে এই হত্যার ঘটনাগুলো ঘটছে।
এদিকে ঘটনার সময় তার মামাতো ভাই পলিন অদূরে ছিলেন বলে জানা গেছে। তিনি তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পলিন জানান, বাবলুকে পেছন থেকে গুলি করা হয়েছে। কারা বা কেন এ ঘটনা ঘটিয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কিছু বলতে পারছি না।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, খামার টিলা এলাকায় বাবলু, তার ভাই শাহীন এবং মামাতো ভাই পলিন যৌথভাবে টিলা কেটে মাটি বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এটি তার নানার মালিকানাধিন টিলা। এ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, নিহত বাবলু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। এই কারণে তিনি অপরাধীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। তবে এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাটি কাটার দ্বন্দ্ব জড়িত কিনা, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
নিহতের স্ত্রী লিজা মনি বলেন, আমি হাটহাজারী উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেয়েকে নিয়ে ভর্তি ছিলাম। উনার সাথে সর্বশেষ কথা হয় শুক্রবার সন্ধ্যায়। আজ (শনিবার) সকালে তার হাসপাতালে আসার কথা ছিল। ভোরে আমার দেবর ফোন করে জানায় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তিনি আরো জানান, তিনি প্রতিবাদী ছিলেন। যেকোন বিষয়ে প্রতিবাদ করত। কয়েকদিন পূর্বে স্থানীয় কয়েকজনের সাথে দ্বন্দ্ব হয়েছিল। পরে তা সমাধান হয়। সর্বশেষ তিনদিন পূর্বে চৌধুরী মার্কেট এলাকায় কয়েকজনের কথা কাটাকাটি হয়। সেখানে অস্ত্রের বিষয় নিয়ে কথাবার্তা হয়। এইসময় দুষ্টুমির ছলে তিনি ভিডিও করেন। এই বিষয়ে খুন হয়েছে কিনা জানি না। এছাড়া তিনি ইট, বালুর বোকার করতেন।
নিহতের বাবা আবুল কালাম সওদাগর বলেন, ‘ঘটনাস্থল হচ্ছে বাবলুর নানার খামার বাড়ি। সেখানে তার নানীর ফাতেহার দাওয়াত খেতে গিয়েছিল। ফেরার পথে বড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে তার পথরুদ্ধ করে তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। খুনিরা বিভিন্ন উপায়ে আমাদের হুমকি দিচ্ছে। মামলা করলে মেরে ফেরার হুমকি দিচ্ছে। পুলিশ জানে খুনি কারা। তারা তাদের গ্রেপ্তার করছে না। কোন প্রদক্ষেপ নিচ্ছে না। আমরা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আশ্বাসে অবরোধ তুলে নিয়েছি। দাফন শেষে আমরা থানায় গিয়ে মামলা দায়ের করব। প্রশাসনের আশ্বাস অনুসারে আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে আসামী গ্রেপ্তার না হলে আমরা থানা ঘেরাও করব।
নিহতের শাশুড়ি পরিচয়ে এক নারী বলেন, আমাদের মেয়ের জামাই আমাদের বাড়িতে থাকে। গত শুক্রবার আমার নাতনির ডায়রিয়া হওয়ার কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জামাই কাছে টাকা না থাকায় তিনি কাজে এসেছেন। কাজে এসেই তিনি খুন হন। তিনি গাড়ি চালাতেন, কৃষি কাজ এবং দিনমজুরের কাজ করতেন। এখন আমার মেয়ে এবং আমার নাতনির কি হবে?
ঘটনাস্থলে আসা রাউজান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক অংছিং মারমা বলেন, একটি অনাঙ্ক্ষিত হত্যাকাণ্ডে বিক্ষুব্ধ জনতা সড়ক অবরোধ করে রাখেন। আমরা ঘটনার জড়িতদের গ্রেপ্তারে জোরদার প্রদক্ষেপ গ্রহণ সহ নিহতের দুই কন্যার ভরণপোষণের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে আশ্বাসে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী অবরোধ তুলে নেন।
রাউজান থানার অফিসার ইনচার্জ সাজেদুল ইসলাম পলাশ বলেন, পরিবার থেকে জেনেছি তিনি মাছ ধরতে গিয়েছিল। সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়। আমরা কয়েকজন খুনিদের শনাক্ত করেছি। তাদের গ্রেপ্তারে ইতোমধ্যে অভিযান শুরু করেছি। তিনি আরো বলেন, গ্রামবাসীসহ নিহতের স্বজনরা নানান দাবীর প্রেক্ষিতে সড়ক অবরোধ করে রেখেছি। আমরা তাদের দাবীর সাথে একমত হলে তারা সড়ক অবরোধ তুলে নেন। যান চলাচল স্বাভাবিক করতে পুলিশ কাজ করছে।
উল্লেখ্য, বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এটি রাউজানের দ্বিতীয় হত্যাকান্ড। এরপূর্বে গত ২৫ ফেব্রুয়ারী পূর্বগুজরায় মুজিবুর রহমান ভান্ডারি নামে এক যুবদল নেতা খুন হয়।
