শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

চেরাগী পাহাড় দৈনিক আজাদী চত্ত্বরে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন

৫ জানুয়ারি জন্মদিনেই ছড়ার জাদুকর সুকুমার বড়ুয়ার অন্তেষ্টিক্রিয়া

গাজী জয়নাল আবেদীন, রাউজান
আগামী ৫ জানুয়ারি একুশে পদকপ্রাপ্ত ও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারজয়ী প্রখ্যাত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়ার ৮৮তম জন্মদিন পালনের কথা ছিল। জন্মদিনের তিন দিন আগে শুক্রবার (২ জানুয়ারি) ভোর ৬টা ৫৫ মিনিটে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরাস্থ জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অনন্তলোকে অনন্তযাত্রায় সামিল হন তিনি।
 পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৫ জানুয়ারী তাঁর জন্মদিনেই চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার বিনাজুরী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যম বিনাজুরী গ্রামে নিজ বাড়িতে তাঁর অন্তেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হবে।
পারিবারিক সূত্র জানায়, ঠান্ডাজনিত অসুস্থতায় কয়েক দিন আগে সুকুমার বড়ুয়াকে চট্টগ্রাম নগরীর একটি মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বৃহস্পতিবার কিছুটা সুস্থ হলে তিনি গ্রামের বাড়িতে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। বাড়ি ফেরার পথে শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তাঁকে রাউজান পৌরসভার গহিরা জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই শুক্রবার ভোরে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এর আগে ২০০৬ সালে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তাঁর ডান পা অবশ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তিনি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন।
১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার মধ্যম বিনাজুরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সুকুমার বড়ুয়া। তাঁর পিতা ছিলেন সর্বানন্দ বড়ুয়া। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ননীবালা বড়ুয়া, তিন কন্যা চন্দনা, রঞ্জনা ও অঞ্জনা বড়ুয়া এবং একমাত্র পুত্র অরূপ রতন বড়ুয়াসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘সুকুমার শিশু পাঠাগার’র সামনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাশবাহী গাড়িতে রাখা হয়েছে তাঁর মরদেহ। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা শেষবারের মতো প্রিয় ছড়াকারকে দেখতে ভিড় করেন।
নগরীর মুরাদপুর থেকে আসা তসলিম খাঁ লাশবাহী গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কবিকে উৎসর্গ করে লেখা নিজের ছড়া পাঠ করেন। তিনি বলেন, সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া পড়েই ছড়া লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছি।
ওমরগনি এম.ই.এস. কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক গোফরান উদ্দিন টিটু বলেন, সুকুমার বড়ুয়া ছিলেন বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যের এক অনন্য মহারাজা। ছোটবেলা থেকেই পাঠ্যবইয়ে তাঁর ছড়া পড়ে আমরা বড় হয়েছি। আগামী ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম একাডেমিতে তার জন্মদিন উদযাপনের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু তার ৩দিন পূর্বে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।
মেঝ মেয়ে রঞ্জনা বড়ুয়া বলেন, ২০২২ সাল থেকে বাবা গ্রামে বসবাস করছিলেন। প্রতি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার তিনি শিশু-কিশোরদের নিয়ে পাঠাগারে আড্ডা দিতেন, ছড়া শোনাতেন ও বই পড়তে উৎসাহ দিতেন। তিনি জানান, একমাত্র ভাই অরূপ রতন বড়ুয়া স্পেন থেকে দেশে ফিরলে জন্মদিনেই বাবার অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
তিনি আরো বলেন, ১৯৭৯ সালে বাবা আমাদের ৩ বোনকে নিয়ে ছড়া লিখেন। আমি সব জায়গায় ছাড়াকার সুকুমার বড়ুয়ার মেয়ে পরিচয় দিয়ে গর্ববোধ করি।
স্ত্রী ননীবালা বড়ুয়া বলেন, ‘আমি একা হয়ে গেলাম। যেখানে যায় সেখানে ছড়াকারের স্ত্রী হিসেবে সবাই আমাকে সম্মান দেখায়, ছবি তুলে, ছড়া বলতে বলে। যেমনটা আপনি করছেন। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, তিনি যখন ছড়া লিখতেন তখন আমি দেখতে গেলে বলতেন কি দেখছো, ঐখানে গিয়ে বই পড়। লেখা শেষ হলে ডেকে বলতেন- তোমার হাতের লেখা সুন্দর। ছড়াটি দেখে দেখে কপি করে দাও। আমি লিখে দিতাম।
মাত্র তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করলেও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে সুকুমার বড়ুয়া বাংলা শিশুসাহিত্যে নিজস্ব অবস্থান গড়ে তোলেন। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে ১৯৯৯ সালে স্টোরকিপার হিসেবে অবসর নেন।
১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘পাগলা ঘোড়া’ গ্রন্থের মাধ্যমে তাঁর গ্রন্থপ্রকাশের সূচনা। এরপর প্রায় ছয় দশক ধরে অসংখ্য জনপ্রিয় ছড়াগ্রন্থ রচনা করেন।উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- ভিজে বেড়াল (১৯৭৬, মুক্তধারা), চন্দনা রঞ্জনার ছড়া (১৯৭৯, মুক্তধারা), এলোপাতাড়ি (১৯৮০, বাংলা একাডেমী), নানা রঙের দিন (১৯৮১, শিশু একাডেমী), সুকুমার বড়ুয়ার ১০১টি ছড়া (১৯৯১, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র), চিচিং ফাঁক (১৯৯২, ওলটপালট প্রকাশনী), কিছু না কিছু (১৯৯৫, বিশাখা প্রকাশনী), প্রিয় ছড়া শতক (১৯৯৭, মিডিয়া), বুদ্ধ চর্চা বিষয়ক ছড়া (১৯৯৭, সৌগত), ঠুসঠাস্ (১৯৯৮, প্রজাপতি প্রকাশন), নদীর খেলা (১৯৯৯, শিশু
একাডেমী), আরো আছে (২০০৩, আরো প্রকাশন), ছড়াসমগ্র (২০০৩, সাহিত্যিকা), ঠিক আছ ঠিক আছে (২০০৬, প্রবাস প্রকাশনী, লন্ডন), কোয়াল খাইয়ে (চট্টগ্রামের
আঞ্চলিক ভাষায় রচিত ছড়াগ্রন্থ, ২০০৬, বলাকা, চট্টগ্রাম), ছোটদের হাট (২০০৯, শিশু একাডেমী) ও লেজ আবিষ্কার (২০১০, প্রথমা)।
তাঁর লেখা ‘চিচিং ফাঁক’ ছড়াটি ১৯৭২ সালে ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়। ১৯৭৮ সাল থেকে জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে তাঁর ছড়া অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ব্যঙ্গ, রস, নৈতিক শিক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাঁর ছড়ার বৈশিষ্ট্য। এ জন্যই তিনি ‘ছড়ারাজ’, ‘ছড়াসম্রাট’ অভিধায় পরিচিতি লাভ করেন।
জীবদ্দশায় তিনি সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে -২০১৭ সালে একুশে পদক, ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার,১৯৯২ সালে ঢালী মনোয়ার স্মৃতি পুরস্কার, ১৯৯৪ সালে বৌদ্ধ একাডেমি পুরস্কার, ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব সম্মাননা, অবসর সাহিত্য পুরস্কার, ২০০৯ সালে রাউজান প্রেসক্লাব সম্মাননা, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার,
আনন ফাউন্ডেশন আজীবন সম্মাননা ও চন্দ্রাবতী শিশুসাহিত্য পুরস্কার। এছড়াও অগণিত সম্মাননা ও সংবর্ধনা লাভ করেন।
তাকে উৎসর্গিত করে এপর্যন্ত ৮ টি বই প্রকাশিত হয় এবং তার উপর প্রকাশিত বই ও সাময়িকীর সংখ্যা ৪টি। ছন্দের এই অনন্য শিল্পীর মৃত্যুতে বাংলা শিশুসাহিত্যে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।
আজ শনিবার সকাল  সাড়ে ১১টায় সুকুমার বড়ুয়ার মরদেহ নগরীর চেরাগী পাহাড়স্থ দৈনিক আজাদী কার্যালয়ের সামনে নেওয়া হয়। সেখানে বেলা ১টা পর্যন্ত কবি, সাহিত্যিক, ছড়াকারসহ সর্বস্তরের মানুষ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করারর পর  মরদেহ গ্রামে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রামের বাড়ি রাউজানে বিনাজুরীতে চলছে তার শেষ যাত্রার প্রস্তুতি।

এই বিভাগের সব খবর

২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রত্যয় অর্থমন্ত্রীর

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর এবং বিশ্বমঞ্চে উন্নত ও মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠায় সরকারের লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত...

ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় শিক্ষককে মারধর, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার

নগরের আকবরশাহ থানা এলাকায় ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় মোজাহিদুল ইসলাম (৪১) নামে এক স্কুলশিক্ষককে মারধরের ঘটনায় অভিযুক্ত রাজুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) তাকে...

রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য কর্ণফুলী টানেলে নিয়ন্ত্রিত যানচলাচল করবে

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের আওতাধীন কর্ণফুলী টানেলের রুটিন রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য ২৪ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত ৬ ঘণ্টা ট্রাফিক ডাইভারসনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিতভাবে যানচলাচল অব্যাহত রাখা...

সর্বশেষ

২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রত্যয় অর্থমন্ত্রীর

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে...

ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় শিক্ষককে মারধর, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার

নগরের আকবরশাহ থানা এলাকায় ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় মোজাহিদুল ইসলাম...

রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য কর্ণফুলী টানেলে নিয়ন্ত্রিত যানচলাচল করবে

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের আওতাধীন কর্ণফুলী টানেলের রুটিন রক্ষণাবেক্ষণ কাজের...

হরমুজে মাইন বসানো নৌযান ধ্বংসের নির্দেশ ট্রাম্পের

কৌশলগত হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য ইরানের ওপর...

উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি গণসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি : চসিক মেয়র

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন,...

নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে ওয়ানডে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ

ব্যাটার নাজমুল হোসেন শান্তর সেঞ্চুরি এবং পেসার মুস্তাফিজুর রহমানের...