রাউজানে এক শিক্ষককে ঘিরে এমন ভালোবাসার ঢেউ, যা সাধারণত দেখা যায় না। শ্রদ্ধা, ভালবাসা আর অশ্রুসিক্ত আবেগে প্রিয় প্রধান শিক্ষিকা জান্নাতুন নাহার-কে যে রাজকীয় বিদায় দেওয়া হয়েছে, তা রাউজানের ঊনসত্তর পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।
রবিবার (১৬ নভেম্বর) দুপুরে বিদ্যালয়ের মাঠ পরিণত হয় এক আবেগঘন মিলনমেলায়। বিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পরিচালনা কমিটি ও এলাকাবাসীর আয়োজনে প্রধান শিক্ষিকার অবসর উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয় এক বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. নিজাম উদ্দীন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন রাউজান উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জাহেদুল ইসলাম, প্রাক্তন শিক্ষার্থী মো. রাসেল, রাজুসহ আরও অনেকে। মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্কুলের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষকরা আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। সাবেক শিক্ষার্থীরা রাজকীয় আয়োজনের অংশ হিসেবে ফুলে সজ্জিত গাড়িতে তাদের প্রিয় শিক্ষিকাকে বাড়ি থেকে বিদ্যালয় পর্যন্ত নিয়ে আসেন। চারদিকে ফুলের বৃষ্টি আর আবেগঘন স্লোগানে পুরো পরিবেশ তখন উৎসবে- বিদায়ী শোকের মিশ্রণে ভারি হয়ে ওঠে। মঞ্চে ওঠানোর পর তাঁকে দেয়া হয় সম্মাননার ক্রেস্ট ও ফুলেল শুভেচ্ছা। সহকর্মী শিক্ষকদের বক্তব্যে উঠে আসে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তারা বলেন, ম্যাডামের শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। সময়নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা আর দায়িত্ববোধ দিয়ে তিনি পুরো বিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তাঁর কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলা আমাদেরও অনুপ্রাণিত করেছে। ভবিষ্যতে আমরা যেখানেই দায়িত্ব পালন করি না কেন, স্যারকে অনুসরণ করেই করব।
২০০৮ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর থেকে জান্নাতুন নাহারের নেতৃত্বে বিদ্যালয় পায় এক নতুন রূপ। শিক্ষার মানোন্নয়ন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড-সব ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন অনুকরণীয় ছাপ। ২০১০ সালে তিনি চট্টগ্রাম জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন। ২০১৫ সালে একক সেরা শিক্ষক হিসেবে তিনি মালয়েশিয়া সফরের সুযোগ পান। তাঁর নেতৃত্বে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে একাধিকবার ফুটবলে বিজয়ী ও রানারআপ হয়। এছাড়া অংক দৌড় ও অন্যান্য ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়ও অর্জন করে বহু সাফল্য। বিদায় অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তে চোখের পানি লুকোতে পারেননি কেউই। শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ এলাকাবাসীও কেঁদেছেন একজন মেধাবী, সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষিকার বিদায়ে। তাঁর প্রতি ভালোবাসার এমন রাজকীয় সম্মান দেখিয়ে রাউজানবাসী প্রমাণ করল, একজন ভালো শিক্ষকের জায়গা শুধু বিদ্যালয়ে নয়, মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে থাকে।
