চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা ভেঙ্গে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ নামে আরো একটি উপজেলা হতে যাচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব আব্দুর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রি-নিকার সভায় নতুন এই উপজেলা গঠনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত শনিবার গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছেন। অক্টোবরে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় বিষয়টির চূড়ান্ত হবে। সূত্রমতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক সুবিধা, উন্নয়ন ত্বরান্বিত করণ ও জনসেবার মানোন্নয়নের স্বার্থে এ দাবি স্থানীয়ভাবে উত্থাপিত হয়ে আসছিল। এই সিদ্ধান্ত বাস্তাবায়িত হলে প্রশাসনিক কার্যক্রম সহজ হবে এবং সেবাপ্রাপ্তি আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে। সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর এ বিষয়ে গেজেট এবং প্রশাসনিক কাঠামো গঠন প্রক্রিয়া শুরু হবে।
স্বীকৃতি পাওয়া ভুজপুর থানা নিয়ে বিস্তৃত ৪৭০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের প্রায় আড়াই লাখের বেশি মানুষ অধ্যুষিত এলাকাটি। এবার দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলনে উচ্ছ্বসিত এলাকাবাসী। তারা আনন্দে মিষ্টি বিতরণ করেছেন। ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা হিসেবে প্রাথমিক স্বীকৃতি দেওয়ায় তারা সরকার বাহাদুরকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০০০ সালের পর থেকে ফটিকছড়ি উপজেলাকে ভেঙ্গে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা হিসেবে রূপান্তরের দাবী জোরালো হতে থাকে। দলমত নির্বিশেষে উত্তরের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে সক্রিয় হন। পরবর্তীতে বিএনপি-চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর উপজেলা বাস্তবায়ন কচ্ছপ গতিতে এগোতে থাকে। নানা বাঁধা-আপত্তিতে থমকে যায় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর উপজেলা বাস্তবায়নের বিষয়টি আবারও জোরালো হয়। পরে গত ৫ আগষ্ট পরবর্তী সময়ে বহু ছড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে প্রি-নিকার সভায় দাবিটি অনুমোদন হয়।
২০০৭ সালের ২১ জুলাই ফটিকছড়ি থানার ২১টি ইউনিয়নের মধ্যে উত্তরের বাগানাবাজার, দাঁতমারা, নারায়ণহাট, ভুজপুর, হারুয়ালছড়ি ও সুয়াবিল ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয় ‘ভূজপুর’ থানা। ভূজপুর থানার উত্তরের রয়েছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পূর্বে খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি ও রামগড়, পশ্চিমে মিরসরাই, সিতাকুন্ড ও দক্ষিণে হাটহাজারি উপজেলা। বিশাল আয়তনের এ অঞ্চলে রয়েছে ১৮টি চা-বাগান, ২টি রাবার বাগান, ২টি পুলিশ ফাঁড়ি, ৯৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২২টি মাদ্রাসা ও তিনটি স্কুল এন্ড কলেজ। বাজার ও ব্যবসা-বাণিজ্যকেন্দ্র রয়েছেন অন্তত ৩০-৩৫টি। এছাড়াও রয়েছে নানা সরকারি-বেসরকারি অন্তত দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান। ভারত সীমান্ত ঘেঁষা এলাকা এবং সদর থেকে অন্তুত ৩৮ কিলোমিটার দুরে হওয়ায় স্বাধীনতার পর থেকে উত্তরে আরেকটি উপজেলার পুরোনো দাবিটি অবশেষে পূরণ হওয়ার সূচনাতে উৎফুল্ল বিশাল এলাকার মানুষ। তারা প্রাথমিক স্বীকৃতিতে সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
ভুজপুরের বাসিন্দা ও দাঁতমারা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শফিউল আজম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা খুবই আনন্দিত। প্রাণের দাবিটি আড়াই দশক পর পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে। আমি অবিলম্বে দাঁতমারায় উপজেলার অবকাঠামোগত কার্যক্রম শুরু করার দাবি জানাচ্ছি। আশাকরি এবার আমাদের বঞ্চনা ও অবহেলার অবসান ঘটবে।’ হেঁয়াকো এলাকার বাসিন্দা সাংবাদিক কামরুল হাসান সবুজ বলেন, ‘দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ‘উত্তরাঞ্চলে একটি উপজেলা’ করা। এখন সেই দাবি এখন বাস্তবায়নের পথে। এটি বর্তমান সরকারের শ্রেষ্ঠ উপহার। এজন্য সরকারের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’ ঢাকাস্থ উত্তর ফটিকছড়ি সমিতির সভাপতি তৌহিদুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘উত্তরের মানুষ দীর্ঘদিন যাবৎ নানাভাবে বঞ্চিত ছিলাম। নতুন উপজেলা বাস্তবায়ন হলে আমাদের নানাবিধ কর্মকান্ডে আলোর পথ দেখাবে। আমরা উচ্ছ্বসিত ও আনন্দিত।’ ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘প্রি-নিকারে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ নতুন উপজেলা হিসেবে অনুমোদন পেয়েছে। সবার দাবির প্রেক্ষিতে এটি সরকারের চলমান প্রক্রিয়া। দাবী পূরণে সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তিনি বলেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এতে সরকারের সব বরাদ্ধই দ্বিগুণ হবে। হয়তো অবকাঠামো গড়ে উঠতে সময় লাগবে। তবে সেবা কার্যক্রম দ্রুতই চালু হবে। এটি জনগণের উন্নয়ন ও সেবা নিশ্চিতে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।’
ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কর্ণেল (অব.) আজিম উল্লাহ বাহার বলেন, ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ একটি গুরুত্বপূর্ণ, আয়তনে বিশাল ও জনবহুল এলাকা। দীর্ঘদিন পর সেখানকার লোকজন নতুন উপজেলার স্বীকৃতি পাচ্ছেন। এতে আমি দল ও ব্যক্তিগতভাবে খুবই আনন্দিত।’ এদিকে দীর্ঘ আড়াই দশক পর দাবি পূরণ হওয়ায় একাবাসীর মাঝে আনন্দ উচ্ছ্বাস দেখা দিলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ঘোষিত উপজেলার নাম,স্থান,অবদান নিয়ে নানান জন ভিন্ন মত প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
