আগেই জানা ছিলো হৃদয় মন্ডল ঢাকায় চিকিৎসা শেষে বাসায় ফেরেননি।এক আত্মীয় ঢাকায় বাস করেন,তিনি সেখানেই উঠেছেন।সপ্তাহ খানেক পরে ফিরবেন বিনোদপুরের বাসায়।তিনি নেই জেনেই গিয়েছিলাম আজ বিনোদপুরে।উদ্দেশ্য সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে বাস্তবিক ধারণা নেওয়া।কেননা কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন
তাঁর পরিবারের সদস্যরা।হৃদয় মন্ডলের শ্বাশুড়ি
রেনুকা হাওলাদার (৮০) সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, সোমবার(১১ এপ্রিল) সকালে তিনি হাঁটতে বেড়িয়েছিলেন।কয়েকজন ছেলে তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে।বাসার ছাদে গেলে ইট হাতে কয়েকজন মারতে তেড়ে এসেছিলো।বাড়ীর গৃহকর্মী অনিতা সাহাও একই ধরনের কথা বলেছেন।এই প্রতিবেদক যখন বিনোদপুরে পৌঁছান তখন বিকেল চারটা।স্কুলের কাছে বিনোদপুর
গ্রামে প্রবেশ পথের মোড়ে কয়েকজন গ্রামবাসী জটলা করে বসেছিলেন। মেইন রোডে দুটো সংবাদ চ্যানেলের সাংবাদিক উপসংহার বক্তব্য রেকর্ড করছিলেন।স্থানীয় লোকজনের মনোভাব বুঝতে সাপ্তাহিক স্লোগান এর গতকাল প্রকাশিত সংখ্যার একটি
কপি নেতৃস্থানীয় গোছের একজন সালাউদ্দিন কাজীর হাতে তুলে দিয়ে আলাপের সূত্রপাত করি।উপস্থিত কয়েকজন টিপ্পনীর সুরে প্রকারান্তরে নিজেদের ক্ষুব্ধ মনোভাবেরই প্রকাশ ঘটান।নানাজনের নানা মত শুনতে পাচ্ছিলাম। তখনই উপস্থিত সবাইকে ১০ তারিখের জামিন শুনানিতে আইনজীবীদের কিছু বক্তব্য জানাই।প্রশ্ন করি,সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি সঠিক ভাবে বিষয়টি সুরাহার উদ্যোগ নিলে আজ এটা আন্তর্জাতিক ইস্যু হয়ে উঠতোনা।সালাউদ্দীন কাজীকে প্রশ্ন করি, এই
ঘটনায় আসলে ক্ষতি হয়েছে কার বলতে পারেন ভাই?তিনি সহ সকলেই নিরব থাকেন।
বলি,আসল ক্ষতি হয়েছে এই অঞ্চলের সূদীর্ঘ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গর্ব করার মতো ঐতিহ্যের। ক্ষতি হয়েছে ১০৩ বছর পার করতে থাকা ঐতিহ্যবাহী বিনোদপুর রাম কুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের।হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের ঘটনায় পুরো পৃথিবীতে এই গ্রাম ও স্কুল কলংকিত আর নিন্দিত হয়েছে।উপস্থিত সকলেই তখন মাথা নেড়ে সহমত পোষণ করেন।সেখান থেকে বিদায় নিয়ে ঢুকে পড়ি গ্রামের ভেতর।অনেকের সাথে কথা হয়। যে বিষয়টি এই প্রতিবেদকের নিকট বারবার উঠে এসেছে, তাহলো অনেক লোকজনই অন্য কারোর কাছ থেকে শুনেছেন, নিজের কানে সেই অডিও রেকর্ড শুনতে না পেলেও তিলকে তাল বানিয়ে ছড়ানো গুজবের উপর আজও বিশ্বাস করে আছেন যে হৃদয় চন্দ্র মন্ডল ইসলাম ধর্ম নিয়ে ভয়ানক অবমাননাকর কথা বলেছেন, একজন মুসলিম হিসেবে তা মেনে নিতে ইচ্ছুক নন অনেকেই।পঞ্চসর ইউনিয়ন যুবলীগের এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,হৃদয় মন্ডলের ঘটনার শেকড় অনেক গভীরে বিস্তৃত। এর সাথে জড়িয়ে আছে খিচুড়ি মহল।মানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা,পরিচালনা পর্ষদের একটি অংশ,শিক্ষকদের কয়েকজন, সমাজের মাতবরদের কয়েকজন, এমনকি প্রগতিশীল চিন্তার ধারক দুই তিনজন।সম্মিলিত সেই গোষ্ঠী লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করেছে হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের নিকট টিউশন নিতে চেয়ে ব্যর্থ হওয়া শিক্ষার্থীদের একটা অংশকে।ঐ মহলের স্বার্থ লুকিয়ে অন্য জায়গায়।যা আমি আপনাকে বলবোনা।অনুসন্ধান চালিয়ে যান, পেয়ে যাবেন বড় কিছু।
বেশ স্মার্ট ও শিক্ষিত এই যুবনেতা আরও বলেন,ভয়টা ভিন্ন জায়গায়।হৃদয় চন্দ্র মন্ডলকে ধর্ম অবমাননার অপবাদ দেবার ফলে শত শত বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসা দুই সম্প্রদায়ের মাঝে অবিশ্বাস, ভয় ও বিদ্বেষের যে বিষ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যদি সঠিক ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দ্বারা দ্রুত সেই বিষকে পানি না করা যায়,তাহলে ভবিষ্যতে বহুবার সাম্প্রদায়িক কারণে শিরোনাম হবে বিনোদপুর।এখন হৃদয় চন্দ্র একক ভাবে পরিবার নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, আগামীতে প্রতিটি হিন্দু পরিবার নিরাপত্তার অভাবে ভুগবে। এমতাবস্থায় করণীয় কি প্রশ্নে ঐ অঞ্চলের সন্তান দেশবরেণ্য এক চিত্রশিল্পী বলেন,আপনারা সাংবাদিক সমাজ প্রশাসনের উপর মহলে এই বার্তাটি দিন যে,দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রশাসন,স্থানীয় জনপ্রতিনিধি,সূধীজন,উভয় সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় লোকজন,স্কুল শিক্ষক,ছাত্র ছাত্রীদের প্রতিনিধি তথা সমাজের সকল শ্রেণিকে নিয়ে একটি বৈঠকের আয়োজন করে ঘটে যাওয়া সকল তিক্ততা ভুলে বরাবরের মতো সকলে মিলেমিশে চলার শপথ গ্রহনের মাধ্যমে ইতি টানতে হবে এই চাপা অস্থিরতার।আর এটা করতে দেরি করা যাবেনা।বিষয়টির সমাপ্তি টানতে এই উদ্যোগের বিকল্প নেই।
নারায়ণগন্জে ফেরার পথে এই প্রতিবেদক হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের বাসায় গিয়ে তাঁদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং সেই সময় বাসায় থাকা হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের এক আত্মীয়া ও হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের একমাত্র ছেলে শ্রেষ্ঠ মন্ডলকে সাহস জোগান।বাবা কেমন আছেন জানতে চাইলে শ্রেষ্ঠ বলে,আপনাদের চেষ্টাতে শুধু বাবু নন আমরা সবাই আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি। নিজ থেকেই সে এই প্রতিবেদকের মোবাইল নম্বর নেয় ও হাসিমুখে বিদায় জানায়।চার ঘন্টার বেশি সময় কাটিয়ে
ফেরার পথে বারবার সেই প্রচার বিমুখ চিত্রশিল্পীর বাতলে দেওয়া উপায়টিকেই বারবার মনে পড়ছিলো। আর বিবেক বলছিলো হৃদয় চন্দ্র মন্ডল অধ্যায়ের সমাপ্তি টানতে ওটাই সময়ের সঠিক দাবি। প্রশাসনকে এমন একটি উদ্যোগ নিতেই হবে। তাই গণমাধ্যমকর্মি তথা আমাদের আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমরা সেটি করবো।

