পুরোনো শহর রামগড় পার্বত্য চট্টগ্রাম দ্বিতীয় মহকুমা। ‘২০সালে প্রতিষ্ঠিত এ শহরের ব্যপ্তি ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত ঘেঁষে। একসময় যে শহর সৌন্দর্যের জন্য পর্যটকদের কাছে কাঙ্খিত ছিল, ক্রমেই তা জৌলুস হারিয়ে এখন কেবলই এক ছোট উপজেলা শহর। তবে আশার কথা, রামগড় স্থলবন্দর নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিশাল এলাকাজুড়ে এখন সাজসাজ রব। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু -১ নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। ফেনী নদীর রামগড় অংশে এ সেতু স্থাপিত। এটিও এখন রামগড়ের অন্যতম আকর্ষনীয় পর্যটন স্পট । প্রতিদিন দূরদূরান্তের দর্শনার্থীরা মৈত্রী সেতু দেখতে ভীড় করেন। কালের সাক্ষী হয়ে এখনো অক্ষুন্ন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যের ধারক মহামুনি বৌদ্ধ বিহার, ১৬৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত। একসময় এখানে মাসাধিককাল ব্যাপী বৈশাখী মেলা হতো। এখন সেই জৌলুশ নেই। সনাতন ও নৃশ্রেণি গোষ্ঠীর লোকজন বিভিন্ন ধর্মীয় পর্বে ভক্তি-অর্ঘ্য নিবেদনে মন্দিরে এসে ঘুরে যান। রামগড় চা বাগানের ৫০ একর আয়তনের পুরোনো দিঘি, যা এখন মৎস্য প্রজেক্ট হিসাবে পরিচিত। মানিকছড়ির রাজবাড়ি, বোটানিক্যাল গার্ডেন। আর আছে লাচাড়ি পাড়া সীমান্তের মনকাড়া রুপ। লাচাড়ি পাড়া সীমান্তের নৈসর্গিক সৌন্দর্য মন্ডিতস্থানটি কলসীমুখ হিসাবেও পরিচিত। কলসী আকৃতির এই স্থানটির চারদিকে ভারতীয় অংশ শুধু মাত্র কলসীর পেটের ভেতরের অংশটি বাংলাদেশের। এ স্থানটি দেখতে ভ্রমণপিপাসীরা হাতছাড়া করেন না। এখানে নৃশ্রেণি ভুক্ত প্রায় ৫০টি পরিবারের বসবাস। বিজিবি জন্মস্থান, ১৯২০ সালের মহকুমা থাকাকালীন পুরোনো এসডিও বাংলোসহ বেশকিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে এখানে। সময় করে ঘুরে যেতে পারেন। ১৭৯৪ সালে গঠিত “ফ্রন্টিয়ার প্রটেকশন ফোর্স” ১৭৯৫ সালে নাম পরিবর্তন হয়ে”রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন” নামে পথচলা শুরু। তখন ৪৪৮ জন সদস্যের দু’টি অনিয়মিত অশ্বারোহী দল ও চারটি কামান নিয়ে শুরু হয় যাবতীয় কার্যক্রম। এসব ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে বিজিবি স্তম্ভের ধারক প্রাচীরে।
রামগড় ছিল মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টর অধীন অন্যতম বেইচ সেন্টার। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ক্যাপ্টেন আবতাবুল কাদের মহালছড়িতে পাকিস্তানীদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে শহীদ হন। তাঁকে রামগড়ে দাফন করা হয়। রামগড় ভ্রমণে এসকল জলন্ত ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিতি হতে পারবেন। উপজেলা সদরের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে পর্যটন পার্ক। কিছুটা সময় এখানেও কাটাতে পারেন। ঝুলন্ত সেতু, লেকের স্বচ্ছ জলরাশি, খাবার রেস্তোরাঁ ইত্যাদি চিত্তাকর্ষক স্থান অপেক্ষা করছে আপনাদের স্বাগত জানাতে। নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় ঘুরে বেড়াতে ভালোই লাগবে।
উত্তর দিক থেকে পার্বত্যাঞ্চলে প্রবেশের একমাত্র রুট রামগড় হয়েই পার্বত্য চট্রগ্রামের সীমানা শুরু। প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্যটক রামগড়ে আসেন। রামগড় শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে আছে চা বাগান। প্রায় ১৪০০ একরের এই বাগানটি বাংলাদেশের অন্যতম নামকরা বাগান। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ৫০ একর আয়তনের দিঘি, চা উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং চা শ্রমিকদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিতি হওয়াটাও রামগড় ভ্রমনের অনিবার্য অংশ। চা শ্রমিকদের আদিবাস ভারতের আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মনিপুরসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে। ব্রিটিশ সরকার তাদের এখানে নিয়ে আসে কয়েক শতাব্দী আগে। সে থেকে এখানেই তাদের বেড়ে ওঠা। যুগ যুগ ধরে নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে কোন রকমে টিকে আছে। তবে তাদের জীবনযাত্রারমান খুবই নিম্ম। বলা যায়, দু:খেই তাদের জীবন গড়া।
খাগড়াছড়ি যাওয়ার পথে মানিকছড়ির রাজবাড়ি এবং পর্যটন কেন্দ্র আলুটিলা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। আলুটিলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে মানিকছড়ির মং রাজবাড়ি অন্যতম দর্শনীয় স্থান। মহান মুক্তিযুদ্ধে মং রাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। যুদ্ধকালীন প্রথম দিকে বহুলোকজন এখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আলুটিলার সুড়ঙ্গপথ এক বিরাট রহস্য। পাহাড়ের ভেতর গুহা। সে গুহায় একদিকে প্রবেশ করে অন্যদিক দিয়ে বের হওয়া যায়। এ ধরনের প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট গুহা দ্বিতীয়টি আশপাশে দেখা মিলবে না।যুগপৎ রোমাঞ্চিত ও বিজরিত হওয়ার মতোই ব্যাপার। খাগড়াছড়ির রহস্যাবৃত আরেকগুহা হচ্ছে আলুটিলা সুড়ঙ্গপথ।
কিভাবে যাবেন: ঢাকা ও চট্রগ্রাম থেকে রামগড় ও খাগড়াছড়ি যাওয়ার সরাসরি কোচ সার্ভিস রয়েছে। রামগড় থেকে সহজেই খাগড়াছড়ি যাওয়া যায়। থাকার ব্যবস্থাও রয়েছে রামগড় ও খাগড়াছড়িতে। ব্যাক্তিমালিকানাধীন কয়েকটি বোর্ডিং ও আবাসিক হোটেল ছাড়াও পূর্বানুমতিসাপেক্ষে সরকারি রেস্ট হাউসে রাত্রিযাপন করা যায়।

