দেশের মিঠা পানির কার্প জাতীয় মাছের একমাত্র মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ হালদা নদীতে অবশেষে দেখা মিলেছে রূপালি সোনা খ্যাত মাছের ডিম। গত রবিবার মধ্যরাত হতে ভোর অব্দি পুরোদমে ডিম ছাড়েন কার্প জাতীয় মা মাছ (রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস)।
হালদা নদীর রামদাসমুন্সির হাট, মাছুয়াঘোনা, আমতুয়া, নয়াহাট, গহিরা, আজিমের ঘাট নয়াহাট কুমসহ বিভিন্ন কুম হতে ৭শত ডিম সংগ্রহকারী ৩শতাধিক নৌকা যোগে প্রচুর পরিমাণে ডিম আহরণ করেন।
প্রতি বছর মা মাছেরা এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত শুধু অমাবস্যা বা পূর্ণিমা তিথিতে অনুকূল পরিবেশে ডিম ছাড়ে। ডিম ছাড়ার এই বিশেষ সময়কে স্থানীয়রা “জো” বলে। এই জো এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অমাবস্যা বা পূর্ণিমা হতে হবে, সেই সাথে প্রচণ্ড বজ্রপাতসহ বৃষ্টিপাত হতে হবে। এই বৃষ্টিপাত শুধু স্থানীয় ভাবে হলে হবে না, তা নদীর উজানেও হতে হবে। ফলে নদীতে পাহাড়ি ঢলের সৃষ্টি হয়। এতে পানি অত্যন্ত ঘোলা ও খরস্রোতা হয়ে ফেনাকারে প্রবাহিত হয়। জো এর সর্বশেষ বৈশিষ্ট্য হল নদীর জোয়ার-ভাটার জন্য অপেক্ষা করা। পূর্ণ জোয়ারের শেষে অথবা পূর্ণ ভাটার শেষে পানি যখন স্থির হয় তখনই কেবল মা মাছ ডিম ছাড়ে।
ডিম ছাড়ার অনুকূল পরিবেশ না পেলে মা মাছ ডিম নিজের দেহের মধ্যে নষ্ট করে দেয়।
এই বছরের গত পাঁচটি জো অতিক্রম হলেও গ্রীষ্মে তীব্র দাবদাহে পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, বৃষ্টি না থাকা, হালদার পানির লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া,পানি প্রবাহ কমে যাওয়াসহ নানা নেতিবাচক কারণে মৌসুম জুড়েই ডিম ছাড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় ডিম সংগ্রহকারীরা নমুনা ডিম ছাড়া পুরোদমে ডিম সংগ্রহ করতে পারেনি। এতে করে ডিম সংগ্রহকারীদের মাঝে চরম হতাশা বিরাজ করছিল।চলতি মৌসুমের সর্বশেষ জো অমাবস্যা তিথিতে গত বরিবার সকাল ১০ টার দিকে নমুনা ডিম ছাড়া শুরু করে মা মাছ এরপর থেকেই ডিম সংগ্রহকারীরা পুরোদমে ডিম পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে ছিল।
রবিবার বিকালে আজিমের ঘাট এলাকার ডিম সংগ্রহকারী আলাউদ্দিন বলেন, আমি মূলত অটোরিকশা চালক। প্রতিবছরের মতো এবারও ডিম সংগ্রহের আশায় ঋণ করে ১০ হাজার টাকায় নৌকা আর জাল ভাড়া নিয়ে ডিম সংগ্রহের আশায় হালদা নদীতে বসে আছি। আজ (রবিবার) যদি মা ডিম না ছাড়ে। চরম অর্থকষ্টে দিনযাপন করতে হবে। অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে রবিবার দিবাগত রাতে ১১ টার দিকে রুইজাতীয় মা মাছ আবার পুরোদমে বিভিন্ন কুমে ডিম ছাড়া শুরু করে। নদীতে মা মাছের ছাড়া সেই নিষিক্ত ডিম বিশেষ ধরনের জাল দিয়ে সংগ্রহ করে ডিম সংগ্রহকারীরা। পরে হ্যাচারিতে রেনু তৈরি করা হয়।
আইডিএফ এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ আন নূর বলেন, আমরা রবিবার রাত ১২ টার দিকে সংবাদ পায় নাপিতের ঘোনা, আমতুয়া কুমে প্রচুর ডিম পাওয়া যাচ্ছে। সোমবার ভোর ৪টা পর্যন্ত হালদার বিভিন্ন পয়েন্ট হতে ৩শতাধিক নৌকা যোগে ৭শত ডিম সংগ্রহকারীরা পর্যপ্ত পরিমাণে ডিম আহরণ করেন। সংগৃহীত ডিমগুলো রেনু তৈরির জন্য ৫টি হ্যাচারী রয়েছে। ৫টি হ্যাচারির মধ্যে ৪টি সরকারি ১ টি বেসরকারি। হ্যাচারিগুলো হল হাটহাজারী অংশে মদুনাঘাট বড়ুয়া পাড়া, সাহমাদারীপুর ও মাছুয়াঘোনা এবং রাউজান অংশের মোবারকখীল ও পশ্চিম বিনাজুরী (আইডিএফ)।
রামদাশমুন্সির হাট পয়েন্টে ডিম সংগ্রহকারী নুরুল আলম মেম্বার বলেন, রবিবার রাত ১১ হতে সোমবার ভোর ৫ টা পর্যন্ত চারটি নৌকায় ১৬ বালতি ডিম সংগ্রহ করেছি।
গহিরার মোবারকখীল এলাকার মো. মোস্তাক বলেন, গত ১৮ জুন নমুনা ডিম দেখা দিলে হালদায় অবস্থান ২ টি নৌকা নিয়ে হালদায় অবস্থান করেছি। এইদিন মধ্যরাতে সেই কাঙ্খিত ডিমের দেখা মিলে। সোমবার ভোর ৪ টা পর্যন্ত ১০ লিটারের বালতিতে ১০ বালতি ডিম সংগ্রহ করি।
হালদা নদীর উপর পিএইচডি ও মাস্টার্স থিসিস ডিগ্রি অর্জনকারী হালদা গবেষক ড.মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গত ১৮ জুন মধ্যরাতে জোয়ারের সময় আমতুয়া পয়েন্টে কার্পজাতীয় মা মাছ পূরোদমে ডিম ছাড়ে এরপর এই ডিম জোয়ার বাড়ার সাথে সাথে আজিমের ঘাট, অংকুরিঘোনা, কাগতিয়ার মুখ, গড়দুয়ারা নয়াহাট, রামদাশ মুন্সির ঘাট, মাছুয়াঘোনা, সত্তার ঘাট, নাপিতের ঘোনা, কাটাখালী, আমতুয়াসহ সহ হালদার বিভিন্ন স্পনিং গ্রাউন্ডে এই ডিম ছড়িয়ে পড়ে।এই বছর হালদা নদী থেকে প্রচুর পরিমাণে ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে ডিমসংগ্রহকারী সহ হালদা সংশ্লিষ্ট সবার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, এবার ১৫ জুন থেকে আমাবস্যার তিথি শুরু হয়েছে। গত ২১ জুন পর্যন্ত তিথির মেয়াদ আছে। ডিম না ছাড়লে ২১ জুনের পর জেলেরা নদী থেকে উঠে আসতেন। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম দেখা গেল, সেভাবে লাগাতার বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল না থাকার পরও ‘মা মাছ’ ডিম ছেড়ে দিল। তিনি আরো বলেন, এরকম একটি দিনের অপেক্ষায় ছিলাম দীর্ঘ ২৩ বছর। আগে গল্পের মত শুনতাম নৌকাতে সংকুলন না হওয়ায় ডিম ছেড়ে দিয়ে আসতে। আজকে নিজের চোখে দেখলাম ডিম ছেড়ে দিয়ে আসতে। এ সফলতা হালদা নদী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকলের।
হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কেজি এবং ২০২১ সালে সাড়ে ৮ হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ হয়েছিল। ২০২০ সালে হালদা নদীতে রেকর্ড ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি ডিম পাওয়া গিয়েছিল। ২০১৯ সালে প্রায় সাত হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে স্থানীয়রা ডিম সংগ্রহ করেছিলেন ২২ হাজার ৬৮০ কেজি, ২০১৭ সালে মাত্র ১ হাজার ৬৮০ কেজি, ২০১৬ সালে ৭৩৫ (নমুনা ডিম) কেজি, ২০১৫ সালে ২ হাজার ৮০০ কেজি এবং ২০১৪ সালে ১৬ হাজার ৫০০ কেজি ডিম সংগ্রহ করেছিলেন ডিম সংগ্রহকারীরা।

