শিক্ষাবিদ সাহিত্যিক অধ্যক্ষ ড. আনোয়ারা আলমের শ্রমলব্ধ গবেষণাগ্রন্থ ‘শিশির থেকে শবনম’ অগ্নিযুগের বিপ্লবী নারী গ্রন্থের প্রকাশন উৎসব ২২ নভেম্বর সোমবার সন্ধ্যায় নগরের মোমিন রোড কদম মোবারক চট্টগ্রাম একাডেমির ফয়েজ নুর নাহার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
চট্টগ্রাম একাডেমি আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেছেন, শবনম খানম শেরওয়ানী বহুগুণের একজন মহীয়সী নারী। ত্রিশের দশকে চট্টগ্রাম শহরের অভিজাত হিন্দু পরিবারের মেয়ে শিশিরকণা গুহ স্কুল জীবনে সম্পৃক্ত হন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্তের সাথে এই আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সূত্রে পরিচয় বন্ধুত্ব, প্রেম এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন পাঠানটুলী এলাকার ঐতিহাসিক খান বাড়ির সন্তান ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী কবি লোকমান খান শেরওয়ানীর সাথে।
বক্তারা আরো বলেন, শবনম খানম শেরওয়ানী মেধা, মননে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, রাজনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায়। ছিলেন কংগ্রেসের মহিলা শাখার সম্পাদক এবং মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিতত একজন নিবেদিত অনুসারী। সাংবাদিকতা জীবনে যেমন পালন করেছেন সমাজ সংস্কারকের ভূমিকা ঠিক তেমনি তাঁর রচিত সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে সমাজ ভাবনা, দেশ ও মানবপ্রেম।
চট্টগ্রাম একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও দৈনিক আজাদীর সহযোগী সম্পাদক রাশেদ রউফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. ওবায়দুল করিম, শিক্ষাবিদ-প্রাবন্ধিক অধ্যক্ষ রীতা দত্ত, দৈনিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চ’র সম্পাদক সৈয়দ উমর ফারুক, অনুভূতি ব্যক্ত করেন গ্রন্থের লেখক অধ্যক্ষ ড. আনোয়ারা আলম।
খ্যাতিমান বাচিক শিল্পী আয়েশা হক শিমুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম একাডেমির মহাপরিচালক প্রাবন্ধিক আমিনুর রশিদ কাদেরী, শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম একাডেমির পরিচালক লায়ন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর মিঞা, শবনম খানম শেরওয়ানীর নাতী হাসান মুরাদ।
অনুষ্ঠানে ড. ওবায়দুল করিম বলেন, শিশির থেকে শবনম তথ্যবহুল এই গ্রন্থে অনেক কিছু শেখার আছে, জানার আছে। গ্রন্থে সমৃদ্ধ একটি অতীতও আছে। এই গ্রন্থের মাধ্যমে ড. আনোয়ারা আলম শবনম খানম শেরওয়ানীকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি আরো বলেন, শবনম খানম শেরওয়ানী ছিলেন কবি, সাংবাদিক, শিক্ষক। তাঁর রচিত সাহিত্য চিরায়ত।
অধ্যক্ষ রীতা দত্ত বলেন, শবনম খানম শেরওয়ানী ডা. খাস্তগীর স্কুলের ছাত্রী ছিলেন। এই স্কুলের ছাত্রী ছিলেন বিপ্লবী প্রীতিলতা এবং কল্পনা দত্তসহ আরো অনেকেই। তিনি আরো বলেন, শবনম খানম শেরওয়ানী শৈল্পিক গুণের অধিকারী ছিলেন। তিনি কলকাতায় যাওয়ার পর শান্তি নিকেতনে সংস্কৃত বিষয়ে লেখাপড়া করেছেন। তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যেমন সফল তেমনি সাহিত্য, সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা ও আত্মবিশ^াসী মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
সৈয়দ উমর ফারুক বলেন, লোকমান খান শেরওয়ানী সম্পর্কে আমার নানা। তার স্ত্রী শবনম খানম শেরওয়ানী। পাঠানটুলীর অনেক বিখ্যাত পরিবার সন্তান লোকমান খান শেরওয়ানী ছিলেন ভারতবর্ষের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা। সেই আন্দোলনের অন্যতম সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়েছিলেন কলকতার শিশির কণাকে। মূলত বিপ্লবী চেতনা থেকে তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠে অবশেষে পরিণয় ঘটে তাদের।
অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে গ্রন্থের লেখক ড. আনোয়ার আলম বলেন, আমি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি প্রাবন্ধিক গবেষক মরহুম সাখাওয়াত হোসেন মজনুকে। মূলত শবনম খানম শেরওয়ানীর তথ্যটা তিনি আমাকে দিয়েছেন। একই সাথে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি মহাত্মা আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ারকে। পঞ্চাশের দশকে তিনি এই মহীয়সী নারীকে কোহিনুর পত্রিকায় প্রথমে সহকারী সম্পাদক ও পরে সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেন। কৃতজ্ঞতা জানচ্ছি বেগম মুশতারি শফিকে। তাঁর বান্ধবী পত্রিকায়ও লেখালেখি করেছেন শবনম খানম শেরওয়ানী। তিনি আরো বলেন, শবনম খানম শেরওয়ানী একবাধারে বিপ্লবী, গান্ধজির অনুসারী, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং বহুগুণের একজন নারী। তাঁকে আবিস্কারের ক্ষেত্রে অন্যতম ছিলেন তার পুত্র ই-লার্নিং এর জনক বদরুল হুদা খান।
সভাপতির বক্তব্যে কবি রাশেদ রউফ বলেন, শিশির থেকে শবনম বইয়ের মাধ্যমে ড. আনোয়ারা আলম বেশ প্রশংসিত হয়েছেন। তিনি শবনম খানম শেরওয়ানীকে নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে অনেক পরিশ্রম করেছেন। তিনি আরো বলেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও শবনম খানম শেরওয়ানী চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ডা. খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন। প্রাক্তন ছাত্রী হিসেবে তাদের নিয়ে গর্ববোধ করতে পারে খাস্তগীর স্কুল। কিন্তু প্রাক্তন ছাত্রী হিসেবে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও শবনম খানম শেরওয়ানীকে নিয়ে স্মৃতিচিহ্ন থাকা দরকার। তাই এই অনুষ্ঠানে মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দাবি রাখতে চাই- ডা. খাস্তগীর স্কুলে তাদের নামে বিদ্যালয় মিলনায়তন কিংবা লাইব্রেরী নামকরণের।

