১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে চট্টগ্রামের রাউজানের শোকাবহ একটি দিন। এই দিন পাকিস্তানি দোসরদের সহযোগিতায় হানাদার বাহিনীরা পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে রাউজান উপজেলার তেরটি স্থানে সকাল ১০ টা হতে শুরু করেন নির্মম ও নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। রাউজানের ইতিহাসের সেই নারকীয় গণহত্যায় ১৫৬ জন হিন্দু, ১০ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়।
রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী আব্দুল ওহাবসহ স্থানীয় আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে কথা বলে জানা যায়, সেদিন বহু সংখ্যক হানাদার বাহিনী আর্টিলারি সাপোর্টে সাঁজোয়া যান যোগে ছত্তার ঘাট এলাকায় চারদিকে বেপরোয়াভাবে গুলি চালায়। পরে তাদের দোসরদের সহযোগিতায় সর্বপ্রথম মধ্য গহিরার শীলপাড়ায় গণহত্যা চালায়। এখানে তারা পাঁচ জন হিন্দুকে হত্যা করে। সেখান থেকে গহিরা হাই স্কুলের পার্শ্ব দিয়ে বিশ্বাস বাড়িতে হামলা করে ৩জন হিন্দুকে হত্যা করে। সেখান থেকে মাইল খানেক পূর্বে রাস্তার পাশে বড়পোল পালিত পাড়ায় প্রবেশ করে ৮ জন হিন্দুকে জড়ো করে হত্যা করা হয়। নিজ বাড়িতে স্থাপিত কুণ্ডেশ্বরী মাতৃমন্দিরে প্রার্থনারত অবস্থায় পাকসেনাদের গুলিতে মারা যান অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহ।
এই দিন পূর্ব গহিরার বৈদ্যবাড়ি ও চৌধুরী বাড়িতে প্রায় ১০০ জন নরনারীকে হাত-পা বেঁধে বেধড়ক মারপিট করে, বাড়ি লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করে। রাস্তার পাশে বাড়ুই পাড়া গ্রামে ৪ জনকে হত্যা করে। জগৎমল্ল পাড়া ঘেরাও করে অগ্নিসংযোগে নির্বিচারে গুলি করে ৩৬ জন হিন্দুকে হত্যা করা হয়। এছাড়া বণিকপাড়ায় ১১ জন, সুলতানপুর ছিটিয়া পাড়ায় ৯ জন, রাউজান পালিতপাড়ায় ১ জনকে হত্যা করা হয়।
সবচেয়ে বড় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় পাহাড়তলী ইউনিয়নের ঊনসত্তর পাড়ার বিভিন্ন স্থান শরণার্থীরা আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই জায়গায় পাক সেনারা চরম তাণ্ডব চালিয়ে ৬৮ জন কে হত্যা করেছিল। এই দিন ইমাম গাজ্জালী কলেজ গেট সম্মুখে কাপ্তাই সড়কে পাকসেনাদের ব্রাশ ফায়রের শিকার হয়ে ঘটনাস্থলে ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তৎমধ্যে ছিলেন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র ছাত্র নেতা সাইফুদ্দিন চৌধুরী খালেদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সম্পাদক আব্দুর রউফ, কানুনগোপাড়া কলেজের অধ্যাপক দিলিপ চৌধুরী প্রমুখ। এদের মধ্যে একমাত্র জীবিত ছিলেন তৎকালীন ছাত্র নেতা বাঁশখালীর সাবেক এমপি সুলতানুল কবির।
সকালে সত্তার ঘাট দিয়ে হানাদার বাহিনীরা প্রবেশ করে উল্লেখিত স্থানগুলোতে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে শহরে যাওয়ার পথে নোয়াপাড়া প্রবেশ করে ৩ জন মুসলমান ও ৯ জন হিন্দুকে হত্যা করে। জানা যায়, সেদিন এ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর থেকে রাউজানের ব্যাপক সংখ্যক হিন্দু ভারতে শরণার্থী হয়ে অবর্ণনীয় কষ্টের সম্মুখীন হয়। হত্যার এমন নির্মমতা ছিল যে, অনেক পরিবারের মধ্যে কেউই বেঁচে রইল না। এদের নৃশংসতা ও হত্যাযজ্ঞ থেকে রেহাই পায়নি পাঁচ বছরের শিশু হতে আশি বছরের বৃদ্ধ। নিরপরাধ, নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষগুলোর ওপর এমন নৃশংসতা, বর্বরতা যেন হিটলারের বর্বরতাকেও সেদিন হার মেনেছিল।
ঘটনার ৪১ বছর পর ২০১২ সালে ১৩ এপ্রিল শুক্রবার সাইফুদ্দিন চৌধুরী খালেদের দেহ চুয়েট এলাকার সমাধিস্থল হতে নিয়ে নগরীর দামপাড়া পল্টন লেনে পারিবারিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পুনঃসমাহিত করা হয়।
নরকীয় হত্যাযজ্ঞের শিকার ১৬৬ জন শহীদদের স্মরণে শহীদ বেদীতে ১৬৬টি মোমবাতি প্রজ্জ্বলন, আলোচনা সভাসহ নানান কর্মসূচী গ্রহন করেছেন রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগ।

