রোজা শুরুর আগেই সরকারকে আরেকটা ধাক্কা দিতে চায় বিএনপি। এ জন্য এক মঞ্চ থেকে শরীক দলের নেতাদের নিয়ে চলমান আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছে দলটি।
মার্চের প্রথম সপ্তাহে ঢাকামুখী বড় ধরনের কর্মসূচির প্রতি জোর দেয়া হচ্ছে। সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের দাবিতে ‘লংমার্চ’ অথবা ‘মহাসমাবেশ’ করবে তারা। কর্মসূচিতে লাখ লাখ মানুষকে সম্পৃক্ত করে সরকারকে দাবি আদায়ে বাধ্য করার চেষ্টা করবে।
বিষয়টি নিয়ে কয়েকদিন আগে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা করেন নেতারা। এর আগে গণতন্ত্র মঞ্চের লিয়াজোঁ কমিটির নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও চূড়ান্ত আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। তবে রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়নি।
অবশ্য বিএনপির আন্দোলনের কর্মসূচি এবং হুমকি-ধমকিকে আমলে নিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। বিএনপির প্রতিটি কর্মসূচির দিন শান্তি সমাবেশের নামে পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে রাজপথে থাকছে ক্ষমতাসীনরা। এমনকি আগামী নির্বাচন পর্যন্ত রাজপথ দখলে রাখার ঘোষণাও দিয়েছে। দলটির নেতারা বলছেন, আন্দোলনের নামে যে কোনো নাশকতা-বিশৃঙ্খলা করলে জনগণের জানমাল রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যুগপৎ আন্দোলনে সমমনা দলগুলো চাইলেও রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে আগাম চূড়ান্ত আন্দোলনের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে চাইছে না বিএনপি। কর্মসূচি মোকাবিলায় সরকারকে আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে বেশি সুযোগ দিতে চায় না দলটি। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসজুড়েই জনগণকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে নানা কর্মসূচি দেবে। এসব কর্মসূচির মধ্যে বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল ও পদযাত্রা থাকবে। আন্দোলনের পরবর্তী কৌশল ও কর্মসূচি নির্ধারণে বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের লিয়াজোঁ কমিটির নেতারা বৈঠক করেন। সেখানে দুটি বিষয় উঠে এসেছে। এর মধ্যে রমজানের আগে চূড়ান্ত আন্দোলনের বিষয় ছাড়াও ঈদের পরপরই আন্দোলনের বিষয় সামনে এসেছে। নেতারা মনে করছেন, রমজানে দ্রব্যমূল্যের অবস্থা সাধারণ মানুষের আরও নাগালের বাইরে চলে যাবে। রোজাদারদের নাভিশ্বাস উঠবে এই মাসে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের ঘাটতিও ভোগাবে সরকারকে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে চান তাঁরা। জনগণের রোষানল কাজে লাগাতে চূড়ান্ত আন্দোলন রোজার পরে নিয়ে যেতে চান তাঁরা। তবে রোজার আগে চলমান আন্দোলনকে একটি চূড়ায় নেওয়ার বিষয়ে একমত নেতারা।
বিএনপির কয়েকজন নীতিনির্ধারক নেতা বলছেন, দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের কার্যত আর মাত্র ৯ মাস বাকি। কয়েক মাসের মধ্যেই আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান তাঁরা। বিশেষ করে সামনে পবিত্র রমজান, পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা এবং বর্ষা মৌসুম বিবেচনায় রেখে মার্চের প্রথমার্ধেই সরকারের ওপর কঠিন চাপ তৈরি করে ভোটাধিকারের দাবি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চান। এ আন্দোলন সফল না হলে ঈদুল ফিতরের পর জুনে পবিত্র ঈদুল আজহার আগের দুই মাসে আবার ‘দ্বিতীয় দফায়’ বড় ধরনের কঠোর কর্মসূচি দেবে বিএনপি। সেটিতেও সফল না হলে নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগের মাস সেপ্টেম্বরেই দাবি আদায়ে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে অগ্নিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হবেন দলটির নেতাকর্মীরা।
দলীয় সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের দশম নির্বাচন ও ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরের নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলনের ব্যর্থতা থেকে অনেক শিক্ষা নিয়েছে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো। আন্দোলন মোকাবিলায় সরকারের অতীতের বাধাবিঘœ ও কৌশলগুলো বিবেচনায় রেখেই এবার চূড়ান্ত আন্দোলনের রোডম্যাপ তৈরি করছে বিএনপি। ঢাকামুখী লংমার্চ বা মহাসমাবেশের ডাক দেওয়ার পরপরই মোকাবিলা করতে নানামুখী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
সূত্র আরও জানায়, সরকারের সেসব কৌশল ও পদক্ষেপকে ব্যর্থ করতেও পাল্টা কৌশল গ্রহণ করার পরিকল্পনা করছে বিএনপি। সরকার এক সপ্তাহ আগে থেকেই হয়তো ঢাকার সঙ্গে সারাদেশের যানবাহন বন্ধ করে দেবে। সরকারের পক্ষ থেকে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে- তা বিবেচনায় রেখেই এবার আন্দোলনের রোডম্যাপ তৈরি করবে রাজপথের বিরোধী দলটি। তবে বেশি আগে সব কৌশল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করে ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি সম্পন্ন করবে তারা। সরকারকে অপ্রস্তুত রেখে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে বড় ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।
এ বিষয়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে সারাদেশের মানুষ স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে সাড়া দিচ্ছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা আন্দোলনকে ধাপে ধাপে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাবেন। তবে চূড়ান্ত আন্দোলনের রোডম্যাপ সম্পর্কে কিছু বলতে রাজি নন তিনি।
অবশ্য সমমনা দল নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আন্দোলনের জন্য চাই নির্দিষ্ট রোডম্যাপ। গত কয়েক মাস আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেছি। আওয়ামী লীগ পাল্টা কর্মসূচি দিয়েছে। এখন কঠোর কর্মসূচি প্রয়োজন, যাতে দাবি আদায়ে সরকারকে নাড়া বা ধাক্কা দেওয়া যায়।
বিএনপি সূত্র জানায়, অতীতের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর আর আন্দোলন বন্ধ করা যায় না। আন্দোলন যা করার তা তপশিল ঘোষণার আগেই করতে হবে। অতীতের এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আরও আগেই আন্দোলনকে সফল করতে চায় বিএনপি।
অবশ্য বিএনপির সহসভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, সবকিছু বিবেচনা করেই ১০ দফা দাবিতে চূড়ান্ত আন্দোলনে নামবেন তাঁরা। আর পিছু হটার কোনো অবকাশ নেই। ডু অর ডাই।

