আগামী ১৬ জানুয়ারি দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের যুগপৎ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বর্তমান সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বিলুপ্ত করা ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবির পাশাপাশি গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৫ শতাংশ বৃদ্ধির সরকারি উদ্যোগের প্রতিবাদে এ সমাবেশ হবে। আজ বুধবার ঢাকায় কেন্দ্রীয় গণ-অবস্থান কর্মসূচির প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, সরকার অন্যায়ভাবে গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে। জনগণ আর পারছে না। ১৬ জানুয়ারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে কেন্দ্রসহ জেলা, উপজেলা, মহানগর, পৌরসভায় সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করা হবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, আজকের গণঅবস্থান মহাসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। আমরা আজ একটা যুগের সন্ধিক্ষণে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। যখন এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছি তখন কেরানীগঞ্জে ৬০০ কর্মী অবণর্নীয় দুর্দশায় কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন। তারা তাকিয়ে আছেন আপনাদের গণআন্দোলনের দিকে। আপনারা তাদের মুক্ত করবেন।
তিনি বলেন, এই সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দেউলিয়া দলে পরিণতি হয়েছে। তাইতো পুলিশ, আমলাদের ওপর নির্ভর করে চলতে হচ্ছে। তারা নির্যাতন-নিপীড়ন ছাড়া কোনোভাবেই ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার পথ পাচ্ছে না। তাইতো এই ভয়াবহ ফ্যাসিস্ট সরকারের থেকে জনগণ মুক্তি চায়।
বিএনপি মহাসচিব অভিযোগ করে বলেন, এই সরকারের লক্ষ্য একটাই, অন্যায়ভাবে একদলীয় শাষণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আমরা তা করতে দিতে পারি না। তাই এই অন্যায়ের প্রতিবাদে সরকার হটানোর আন্দোলন শুরু হয়েছে, সমস্ত রাজনৈতিক দল এক হয়েছে। সুশীল সমাজ, বিশিষ্ট নাগরিকরাও এগিয়ে এসেছেন, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। ১০ দফা নিয়ে সবাই রাজপথে নেমে গেছে। তবে এজন্য আরও শক্তিশালী হয়ে জেগে উঠতে হবে। আসুন জেগে উঠি, জনগণের বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
এসময় গণঅবস্থান কর্মসূচির সভাপতি ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপি যখনই কোনো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দেয়, সরকার ভীত হয়ে বলে আমরা সহিংসতা করার জন্য কর্মসূচি দেই। কিন্তু নেতাকর্মীরা প্রতিবারই প্রমাণ করে বিএনপি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বিশ্বাস করে।
তিনি বলেন, আমরা ১০ দফা দিয়েছি, যে দফার ভিত্তিতে আন্দোলন করে সরকারের পতন ঘটিয়ে সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করে রাষ্ট্রের মেরামতের কাজ শুরু করবো, যা এই সরকারের পক্ষে করা সম্ভব নয়।
এই বিএনপি নেতা বলেন, আমরা জানি সরকার ক্ষমতায় থাকলে এই ১০ দফা মানবে বা। তাই আমরা সরকারের পতন ঘটানোর শপথ নিয়েছি, পরিকল্পনা মাফিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে আন্দোলনের পথে এগিয়ে যেতে হবে। এ সময় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সবাইকে আরও ঐক্যবদ্ধ হতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, আমরা যখন জেল থেকে বের হই, তখন ৪৯১ জন নেতাকর্মী জেলখানায় বন্দি ছিলেন। সবার মুক্তি দাবি করছি। একজন জেলারকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ৭/৮ জন কেন একটা রুমে রেখেছেন। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, জেলখানায় জায়গা নেই। এই যে সারাদেশকে একটি বড় জেলখানায় বন্দি করা হয়েছে। এখানে যারা বসে আছেন, তারাই একদিন আওয়ামী লীগের পতন ঘটাবে। বিএনপির কোনো নেতাকে ছোট করে দেখার কিছু নেই।
মির্জা আব্বাস বলেন, আমরা কাউকে ধাক্কা দিয়ে, টোকা দিয়ে দিয়ে নয়, একটি ভালো নির্বাচনের মাধ্যমে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটাতে চাই। ১০ দফা দাবি মেনে নিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যাবস্থা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বিএনপির এই সিনিয়র নেতা।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানুল্লহ আমান, সদস্য সচিব আমিনুল হক এবং ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদের সঞ্চালনায় অবস্থান কর্মসূচিতে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী বক্তব্য রাখেন।
এদিকে বিএনপির গণ অবস্থানের কারণে রাজধানীর ব্যাস্ততম ভিআইপি সড়কের ফকিরাপুল মোড় থেকে কাকরাইল নাইটিংগেল মোড় পর্যন্ত যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এ এলাকায় সব সড়ক ও অলি গলিতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সরেজমিন এলাকা ঘুরে দেখা যায়- দৈনিক বাংলা থেকে ফকিরাপুল, আরামবাগ থেকে ফকিরাপুল, জিরোপয়েন্ট থেকে বিজয়নগর সড়কে তীব্র যানজট।
নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সকাল ৯টা থেকেই নেতাকর্মীরা জড়ো হওয়া শুরু করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে সড়কের একপাশে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১২টার দিকে সড়কের দু’পাশ বন্ধ করে অবস্থান নেয় বিএনপি নেতাকর্মীরা। তারপরও সড়কের উত্তর পাশ দিয়ে দু-একটি গাড়ি আসলেও পার হতে অনেক সময় লাগছে।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ বৈঠকের পরে ডিএমপি কমিশনার সাংবাদিকদের জানান- বিএনপি নেতারা গণ অবস্থান করার জন্য অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছেন। আমি তাদের বলেছি বুধবার অফিস ডে, হাজার হাজার মানুষ অফিসে যাতায়াত করবে, তাদের চলাচলে যেন কোনো সমস্যা না হয়, গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক রেখে আপনারা ফুটপাতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন। কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায় পুলিশ কমিশনারের সেই অনুরোধ অমান্য করে পুরো সড়ক দখলে নিয়েছে বিএনপি নেতাকর্মীরা।

