বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত লাইলাতুল কদরের ফজিলত ও আমলসমূহ এবং তাওবা

এস.এম. মাঈন উদ্দীন রুবেল
‘শবে কদর’ কথাটি ফারসি। শব মানে রাত বা রজনী আর কদর মানে সম্মান, মর্যাদা, গুণাগুণ, সম্ভাবনা, ভাগ্য ইত্যাদি। শবে কদর অর্থ হলো মর্যাদাপূর্ণ রাত বা ভাগ্য রজনী। শবে কদরের আরবি হলো লাইলাতুল কদর তথা সম্মানিত রাত। সুতরাং লাইলাতুল কদর রাতটি মুসলমানদের জন্য ভাগ্য রজনী হিসেবে সম্মানিত ও পরিচিত। লাইলাতুল কদরের রাত হচ্ছে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম মহা সম্মানিত একটি রাত।
পবিত্র কুরআনুল কারিম নাযিলের মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই রাতকে হাজারের মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ উত্তম ও মহা সম্মানিত রাত হিসেবে আমারদের জন্য দান করেছেন। প্রতিবছর রমজান মাসের শেষ দশকের রাতগুলোর মধ্যে কোনো এক বিজোড় রাত হলো ভাগ্য নির্ধারণ বা লাইলাতুল কদরের রাত।
যে রাতে পবিত্র  কুরআন নাজিল হয়েছে, সে রাতই লাইলাতুল কদর। আল্লাহতায়ালা বলেন: ‘নিশ্চয়ই আমি  কুরআন নাজিল করেছি মর্যাদাপূর্ণ কদর রজনীতে। আপনি কি জানেন, মহিমাময় কদর রজনী কী? মহিমান্বিত কদর রজনী হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালামকে সমভিব্যহারে অবতরণ করেন; তাঁদের প্রভু মহান আল্লাহর নির্দেশ ও অনুমতিক্রমে, সব বিষয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে। এই শান্তির ধারা চলতে থাকে উষা বা ফজর পর্যন্ত। (আল কুরআন, সুরা-৯৭ [২৫] আল কদর)
রমজান মাস পবিত্র কুরআন নাযিলের মাস। শবে কদর কুরআন নাযিলের রাত। এ রাতেই প্রথম পবিত্র মক্কা মুকাররমার হেরা পর্বতের গুহায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে ফেরেশতাদের সরদার হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে রাহমতুল্লিল আলামিন প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর প্রতি সর্বশ্রেষ্ঠ মহাগ্রন্থ আল  কুরআন নাযিল করেন।
এ কারণে আল্লাহ তায়ালা এ রাতের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ রাতে মহান আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মাদিকে হাজার মাসের ইবাদত-বন্দেগি ও আমলের সমান সাওয়াব দান করে। কুরআনুল কারিমের অন্য স্থানে এ রাতটিকে বরকতময় রাত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ পবিত্র  কুরআনে বলেন- হা-মীম। শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। আমি একে ( কুরআন) এক বরকতময় রাতে নাজিল করেছি। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়। আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে, আমিই প্রেরণকারী। আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা দুখান : আয়াত ১-৬)
কুরআন নাযিলের কারণে মর্যাদার এ রাতের কথা উল্লেখ করার পর যে মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে সে মাসের কথাও আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে উল্লেখ করেছেন এভাবে-
আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘রমজান মাস! এমন একটি মাস যে মাসে  কোরআন নাযিল হয়েছে মানবের মুক্তির দিশারি ও হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনরূপে। ’ (সুরা-২ আল বাকারা, আয়াত: ১৮৫)।
সুতরাং লাইলাতুল ক্বদরের রাতে আল্লাহর ওইসব বান্দারা সবচেয়ে বেশি সম্মানিত ও মর্যাদার অধিকারী হবেন, যাদের সঙ্গে  কুরআনের সম্পর্ক বেশি। যিনি কুরআন-সুন্নাহর আলোকেই নিজের জীবন পরিচালিত করবেন। বাস্তব জীবনে কোরআন-সুন্নাহর আমলে জীবন সাজাবেন,আর তারাই হবেন সফল।
রমজানের শেষ দশদিনের যেকোনো বেজোড় রাতে লাইলাতুলকদর তালাশ করা যায়, অর্থাৎ ২১,২৩,২৫,২৭,২৯ রমজান দিবাগত রাতগুলো। তবে অনেক আলেমদের গবেষণা ও ব্যাখ্যায় এবং বুজুর্গানেদ্বীনের মতে ২৬ তারিখ দিবাগত রাত অর্থাৎ সাতাশ তারিখে পবিত্র শবে কদরের অন্যতম সম্ভাব্য রাত। কারণ জগৎ বিখ্যাত ইমাম,আলেম উলামাগন গবেষণা করে দেখলো যে পবিত্র কুরআনুল কারিমের সূরা কদরের মধ্যে কদর শব্দটি ৩ বার উল্লেখ আছে এবং কদর শব্দটিতে আরবি ৯টি হরফ রয়েছে। সুতরাং  ওলামায়ে কেরামগনের গবেষণা মতে কদর শব্দটি ৩ বার থাকায় এবং ৯ টি হরফ বিদ্যমান থাকায় ৩ দিয়ে ৯ কে (৯×৩) গুন করলে ২৭ পাওয়া যায়। অতএব ২৬ তারিখ দিবাগত রাত অর্থাৎ আরবি ২৭ তারিখ রাতই শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলেছেন। তাই বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোতে ২৬ তারিখ দিবাগত রাতই শবে কদর পালন করে থাকে নফল ইবাদত ও জিকির আসকার এর মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা।
মর্যাদার এ রাত পেলে মুমিন বান্দা আল্লাহর কাছে কী প্রার্থনা করবেন? কী চাইবেন? এ সম্পর্কে হাদিসের একটি বর্ণনা এভাবে এসেছে- হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, একবার আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম- হে আল্লাহর রাসুল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনি বলে দিন, আমি লাইলাতুল কদর কোন রাতে হবে তা জানতে পারি, তাতে আমি কী (দোয়া) পড়বো?
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি বলবে-
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আ’ফুয়্যুন; তুহিব্বুল আ’ফওয়া; ফা’ফু আ’ন্নী।’
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল; ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজি, মিশকাত)
লাইলাতুল কদরের মর্যাদা
লাইলাতুল কদরের মর্যাদা এত বেশি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ রাতটি পাওয়ার জন্য শেষ দশকে আজীবন ইতেকাফ করেছেন।
উম্মতে মুহাম্মদীর  উদ্দেশ্যে  রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমি কদরের রাতের সন্ধানে (রমজানের) প্রথম ১০ দিন ইতিকাফ করলাম। এরপর ইতিকাফ করলাম মধ্যবর্তী ১০ দিন। তারপর আমার প্রতি ওহি নাযিল করে জানানো হলো যে, তা শেষ ১০ দিনে রয়েছে। সুতরাং তোমাদের যে ইতিকাফ পছন্দ করবে, সে যেন ইতিকাফ করে। তারপর মানুষ (সাহাবায়ে কেরাম) তার সঙ্গে ইতেকাফে শরিক হয়।’ (মুসলিম শরীফ)
কদর রাতের ফজিলত
মহাগ্রন্থ আল  কুরআন নাযিল হওয়ার কারণে অন্য সব মাসের চেয়ে রমজান মাস বেশি ফজিলত ও বরকতময় হয়েছে। আর রমজানের রাতগুলোর মধ্যে  কোরআন নাযিলের রাত লাইলাতুল ক্বদর সবচেয়ে তাৎপর্যমণ্ডিত একটি রাত।
এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি একে নাযিল করেছি কদরের রাতে। তুমি কি জান ক্বদরের রাত কি? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (সূরা: কদর, আয়াত: ১-৩)।
এ আয়াতের ব্যাখায় মুফাসসিরকুল শিরোমণি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, ‘এ রাতের ইবাদত অন্য হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম’। (তানবিরুল মিকবাস মিন তাফসিরে ইবনে আব্বাসঃ ৬৫৪ পৃষ্ঠা)।
তাবেয়ি মুজাহিদ (র.) বলেন, এর ভাবার্থ হলো, ‘এ রাতের ইবাদত, তেলাওয়াত, দরুদ কিয়াম ও অন্যান্য আমল হাজার মাস ইবাদতের চেয়েও উত্তম। ’
মুফাসসিররা এমনই ব্যাখ্যা করেছেন। আর এটিই সঠিক ব্যাখ্যা। (ইবনে কাসির: ১৮ খণ্ড, ২২৩ পৃষ্ঠা)।
শবে কদরের আমল
সুতরাং লাইলাতুল কদর পেলে এ আমল ও দোয়া রাত অতিবাহিত করা জরুরি। তা হলো-
১. নফল নামাজ পড়া।
২. মসজিদে ঢুকেই ২ রাকাত (দুখুলিল মাসজিদ) নামাজ পড়া।
৩. দুই দুই রাকাত করে (মাগরিবের পর ৬ রাকাত) আউওয়াবিনের নামাজ পড়া।
৪. রাতে তারাবির নামাজ পড়া।
৫. শেষ রাতে সাহরির আগে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া।
৬. সম্ভব হলে সালাতুত তাসবিহ পড়া।
৬. সম্ভব হলে তাওবার নামাজ পড়া।
৭. সম্ভব হলে সালাতুল হাজাত পড়া।
৮. সম্ভব হলে সালাতুশ শোকর ও অন্যান্য নফল নামাজ বেশি বেশি পড়া।
৯.  কুরআন তেলাওয়াত করা। সুরা কদর, সুরা দুখান, সুরা মুয্যাম্মিল, সুরা মুদ্দাসির, সুরা ইয়াসিন, সুরা ত্বহা, সুরা আর-রাহমান, সুরা ওয়াকিয়া, সুরা মুলক, সুরা কুরাইশ এবং ৪ কুল পড়া।
১০. বেশি বেশি দরূদ শরিফ পড়া।
১১. তাওবাহ-ইসতেগফার পড়া। সাইয়্যেদুল ইসতেগফার পড়া।
১১. জিকির-আজকার করা।
১২. কুরআন-সুন্নায় বর্ণিত দোয়া পড়া।
১৩. পরিবার পরিজন, বাবা-মা ও মৃতদের জন্য দোয়া করা, কবর জেয়ারত করা।
১৪. বেশি বেশি দান-সদকা করা।
মহান আল্লাহ পাক কদরের রজনীতে ৭ প্রকার ব্যক্তির দোয়া ও তাওবা কবুল করেনা (যদি না তারা খালিছ দিলে তাওবা করে একেবারে ফিরে না আসে । তারা হলো-
১. মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ী।
২. পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান।
৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী।
৪. জাদুকর, গণক বা জ্যোতিষী।
৫. ইচ্ছাকৃত সালাত/নামাজ পরিত্যাগকারী
৬. চোগলখোর (পরনিন্দাকারী)।
৭. শরিয়তের বিধান ছাড়া কোনো মুসলমানের সাথে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছিন্নকারী।
এই বরকতময় রাতে মহান আল্লাহ সবাইকে ক্ষমা করে দিলেও, উপরের ব্যক্তিরা তাদের পাপের কারণে এই বিশেষ ক্ষমার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এই রাতের ফজিলত ও ক্ষমা পেতে হলে উল্লিখিত পাপাচার থেকে বেঁচে থাকা এবং আন্তরিকভাবে তওবা করা জরুরি।

এই বিভাগের সব খবর

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। আজ বৃহস্পতিবার সকালে সচিবালয়ে তথ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ...

সৌরশক্তির জাগরণ: পাকিস্তান যেভাবে নিরবে বিদ্যুৎ সংকট জয় করল

কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের জ্বালানি খাতের প্রধান সমস্যা ছিল 'লোডশেডিং'। দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যেত এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ অন্ধকারে থাকত। তবে...

লামায় নদীতে গোসল করতে নেমে পর্যটক নিখোঁজ

বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে চলা মাতামুহুরী নদীতে নেমে আব্দুল ওয়াদুদ সায়েম (১৮) নামের এক পর্যটক নিখোঁজ হয়েছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে (১৬ এপ্রিল)...

সর্বশেষ

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সঙ্গে সৌজন্য...

সৌরশক্তির জাগরণ: পাকিস্তান যেভাবে নিরবে বিদ্যুৎ সংকট জয় করল

কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের জ্বালানি খাতের প্রধান সমস্যা ছিল...

লামায় নদীতে গোসল করতে নেমে পর্যটক নিখোঁজ

বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে চলা মাতামুহুরী...

রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার: আইনমন্ত্রী

কার্যক্রম নিষিদ্ধ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে...

আলীকদমে হামের উপসর্গ নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ৬ শিশু, আক্রান্ত পাড়ায় ৪ সদস্য বিশিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীর দল

বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হাম রোগের...

হালদায় শুরু হয়েছে মা মাছের আনাগোনা

দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র জোয়ার ভাটা ও...