২০২৬ সালের কর্মপরিকল্পনা:২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার যাত্রায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় (MoHPW) দেশের ভৌত ও নগর কাঠামোর প্রধান স্থপতি হিসেবে কাজ করছে। ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে, মন্ত্রণালয় গতানুগতিক নির্মাণ পদ্ধতি থেকে সরে এসে টেকসই, জলবায়ু-সহনশীল নগরায়ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসনের দিকে মনোনিবেশ করছে।
ক্রমবর্ধমান নগরবাসীর আবাসন সংকট এবং অবকাঠামোগত চাহিদা মেটাতে আগামী মাসগুলোতে যে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করা হবে, তার একটি রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:
১. ২০২৬ সালের প্রধান অগ্রাধিকারসমূহ:মন্ত্রণালয়ের বর্তমান কর্মপরিকল্পনা চারটি কৌশলগত স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যা দ্রুত উন্নয়নের সাথে পরিবেশ রক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখবে।
(I) সাশ্রয়ী নগর আবাসন ও ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ:
বাংলাদেশে ভূমির স্বল্পতা সবচেয়ে বড় সমস্যা হওয়ায় মন্ত্রণালয় এখন ওপরের দিকে অর্থাৎ বহুতল ভবনে বসবাসের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
* স্যাটেলাইট টাউনশিপ: ঢাকার ওপর চাপ কমাতে ঝিলমিল এবং পূর্বাচল নতুন শহরের মতো এলাকাগুলোতে বহুতল আবাসিক কমপ্লেক্স নির্মাণ।
* সরকারি কর্মচারী আবাসন:
জরাজীর্ণ নিচু ভবনগুলোর পরিবর্তে আজিমপুর ও অন্যান্য প্রশাসনিক এলাকায় বহুতল ফ্ল্যাট নির্মাণ সম্পন্ন করা।
* স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ফ্ল্যাট:
বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য “ভাড়া-ভিত্তিক আবাসন” মডেল সম্প্রসারণ করা, যাতে উন্নয়ন থেকে কেউ পিছিয়ে না থাকে।
(II) জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো:
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা অন্যতম দেশ। মন্ত্রণালয় এখন সব সরকারি কাজে “গ্রিন বিল্ডিং” বা পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণের নিয়ম যুক্ত করছে।
* বন্যা-সহনশীল নকশা: উপকূলীয় এবং হাওর অঞ্চলে নির্মিতব্য সকল সরকারি ভবনে উঁচুতলা এবং দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্রের সুবিধা নিশ্চিত করা।
* পরিবেশবান্ধব উপকরণ:
মাটির উপরিভাগের উর্বরতা রক্ষা এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে ঐতিহ্যবাহী পোড়া ইটের পরিবর্তে হলো ব্লক (Hollow Blocks) এবং কম্প্রেসড আর্থ ব্লকের ব্যবহার বাড়ানো।
III. প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র:
* মডেল মসজিদ: প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চালিয়ে যাওয়া।
* স্বাস্থ্য ও বিচার বিভাগীয় অবকাঠামো:
গণপূর্ত অধিদপ্তর (PWD) জেলা হাসপাতালগুলোর সম্প্রসারণ এবং নতুন বিচার বিভাগীয় কমপ্লেক্স ও থানা নির্মাণের দায়িত্ব পালন করছে।
(IV) নগরের সংস্কার ও উন্মুক্ত স্থান:
* জলাশয় সংরক্ষণ: লেক, খাল ও পার্ক রক্ষার জন্য ‘জাতীয় নগর নীতি ২০২৫’ কঠোরভাবে প্রয়োগ করা (যেমন হাতিরঝিল সম্প্রসারণ এবং পূর্বাচল পানি সরবরাহ প্রকল্প)।
* স্মার্ট সিটি বাস্তবায়ন:
নতুন শহর প্রকল্পগুলোতে আইওটি (IoT) ভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্মার্ট লাইটিং ব্যবস্থা যুক্ত করা।
২. কর্মপরিকল্পনা: আগামী ৬ মাস
এই লক্ষ্যগুলো পূরণে মন্ত্রণালয় আগামী দুই প্রান্তিকের জন্য একটি কঠোর বাস্তবায়ন কাঠামো গ্রহণ করেছে।
পর্যায়:
১-২ মাস
কাজের ক্ষেত্র: প্রকল্প নিরীক্ষা ও প্রযুক্তি গ্রহণ,
মূল লক্ষ্য: সকল উন্নয়ন প্রকল্পের (ADP) ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শতভাগ ই-জিপি (e-GP) পদ্ধতি চালু করা।
পর্যায়: ৩-৪ মাস, কাজের ক্ষেত্র: নীতি ও বিধিবিধান প্রয়োগ,
মূল লক্ষ্য :
কোড হালনাগাদ করা, যাতে ভূমিকম্প প্রতিরোধ এবং ভবনে সোলার প্যানেল থাকা বাধ্যতামূলক হয়।
পর্যায়: ৫-৬ মাস
কাজের ক্ষেত্র: হস্তান্তর ও কার্যক্রম শুরু
মূল লক্ষ্য : পূর্বাচল নতুন শহরের পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা সম্পন্ন করা এবং ঝিলমিল প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দ প্রক্রিয়া শুরু করা।
৩. প্রধান চ্যালেঞ্জ ও আগামীর পথ:
২০২৭ সালের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে কিছু বাধা রয়ে গেছে। মন্ত্রণালয় মূলত তিনটি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন:
* ভূমি অধিগ্রহণ: জনস্বার্থে জমি উদ্ধারের আইনি জটিলতা সমাধান করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
* মূল্যস্ফীতি: নির্মাণ সামগ্রীর (রড ও সিমেন্ট) ক্রমবর্ধমান দামের কারণে প্রকল্পের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা।
* মান নিয়ন্ত্রণ: ঠিকাদাররা যাতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কঠোর নিরাপত্তা ও গুণগত মান মেনে চলে তা নিশ্চিত করা।
> বিশেষজ্ঞ মতামত: ২০২৬ সালের মূলমন্ত্র হলো “বেশি নির্মাণ নয়, উন্নত নির্মাণ”। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (PPP) মাধ্যমে বড় প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন নিশ্চিত করা হচ্ছে, যা আগে সরকারের একার পক্ষে কঠিন ছিল।

