
“আমরা নিজেরা নারী, সেটি ভুলে গেলে চলবেনা। আমাদের ব্যক্তিত্বকে সমুন্নত রেখেই নিজদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে “ গুরুত্বপূর্ণ এই কথাটি বলেই নিজের গল্প, অভিজ্ঞতা, সেকালের নারী আর এই প্রজন্মের নারীদের জন্য বিশেষ বার্তা দিলেন বিশিষ্ট নারী নেত্রী, প্রথম নারী লায়ন্স গভর্ণর কামরুন মালেক। এবারের নারী দিবস উপলক্ষে “স্লোগান” এর পক্ষ থেকে কিছু প্রশ্ন নিয়ে মুখোমুখি হয়েছিলাম কামরুন মালেকের সাথে। আমার বুদ্ধি শক্তি বিকাশের সাথে সাথেই যেই নারীকে আমি দেখে এসেছি, একজন অপরূপ সুন্দরী অর্থাৎ আমার চোখে সেরা এক নারী।
আমার আইডল,আমি ছোট হলেও খুব ফলো করতাম উনার লাইফস্টাইল। চলনে বলনে, আচারে ব্যবহারে, আদর আপ্যায়নে,সামাজিকতা আর আতিথেয়তায় আসলে তাঁর জুড়ি মেলা ভার।উনার লক্ষ্য, আদর্শ,আর কর্মযজ্ঞকে একেবারে ছোট কাল থেকে খুব কাছে থেকেই দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।আজ আনুষ্ঠানিক ভাবে উনার মুখোমুখি বসে যখন সাক্ষাৎকার শুরু করি,আসলে কোন বিষয়টি নিয়েই শুরু করবো তা বুঝে উঠতে পারছিলাম না।উনার বাড়ি “ কোলাহল “এর নান্দনিক পরিবেশে সবুজের সমারোহে গল্প শুরু করলাম। সেই গল্প বাগানের পরিবেশ পেরিয়ে ড্র য়িং রুম হয়ে অন্দরমহল এবং হেঁশেল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।সুপ্রিয় পাঠক, কামরুন মালেকের সাথে আলাপচারিতা এখন প্রশ্নোত্তর সহকারেই উপস্থাপন করছি-
প্রশ্ন :আজ ৮ মার্চ নারী দিবস। এই দিবস টি নিয়ে কিছু বলুন?
উত্তর : আসলে নারী দিবস আজ হলেও আমি বলবো, আমাদের নারীদের জন্য তো প্রতিদিন ই নারী দিবস। কারণ একজন নারী প্রথমেই তার সংসারের কাজের মধ্য দিয়ে ই দিবসের সূচনা করেন।পরিবার,স্বামী, সন্তান, সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব শেষ করেই কিন্তু একজন নারী বাইরের কাজে যায়।কাজেই নারীর জন্য তো তার উপর অর্পিত যে দায়িত্ব থাকে, সেটি পালন করতে গিয়েই প্রতিটি নারী প্রতিদিন ই এই দিবস পালন করছেন।আমরা নারী রাই কিন্তু মা। এটি আমাদের জন্য মহান আল্লাহর দেয়া সেরা এক উপহার। এই মাতৃত্বের মাধ্যমেই আমরা জীবনের যাবতীয় সুখ দুখ ভুলে গিয়ে একটি ভিন্ন পরিবেশ থেকে এসেও নিজেকে অন্য পরিবারে মানিয়ে নিই। আমরা মা,আমরা কন্যা জায়া জননী।এটিই আমাদের বড় পরিচয়।এর পরেও এই আনুষ্ঠানিক নারী দিবসে আমি সর্বস্তরের নারীদের শ্রদ্ধা জানাই।
প্রশ্ন:নারী পুরুষ এর সম অধিকার নিয়ে আপনার চিন্তা ধারা কি?
উত্তর : আসলে আল্লাহ চারটি জিনিস খুব পছন্দ করেন। কন্যা শিশু,অতিথি, বৃষ্টি আর অসুস্থতা। কাজেই যার কন্যা সন্তান নেই, সে তো কিছুটা কম সৌভাগ্যবান! আমাদের সমাজে একটি মেয়ে হলে পরিবার অখুশি হয়,ছেলে হলে খুশিতে আটখানা! এটি ঠিক না।কন্যারাই কিন্তু পিতামাতার কাছেই থাকেন। পুত্রেরা সংসার জগতে প্রবেশ করে অনেক সময় দূরে চলে যায়,কিন্তু কন্যারা শত ক ষ্ট আর ত্যাগ স্বীকার করেই মা বাবার পাশে থাকার চেষ্টা করে। এটাই বাস্তবতা। আর সম অধিকার মানে আমরা নারী পুরুষ একে অপরের প্রতিযোগী নই,আমরা একে অপরের পরিপূরক। আমাদেরকে সব কিছুই মানিয়ে শুনিয়ে ই চলতে হবে।আমার আচরণ চলন বলন পোশাক পরিচ্ছদে মার্জিত ও রুচিসম্মত গেট আপ থাকলেই যে ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠবে,তখন একজন নারী কে যে কেউ ই শ্রদ্ধার চোখে দেখবে।নিজেদের কর্ম আর যোগ্যতা দিয়েই নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে হবে।তবে সঠিক জীবন সংগী এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।তিনি যদি সহযোগী না হন, কিংবা সহযোগিতা না করেন,তাহলে কোন নারীর পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব না।
প্রশ্ন: আপনি অনেক গুলো সংগঠনের সাথে ই সাফল্যের সাথে কাজ করেছেন।কাদের সাথে কাজ করে বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন?
উত্তর : লায়ন্স ক্লাবের সাথে।কারণ এটি একটি ইন্টারন্যাশনাল সেবাধর্মী ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান।এখানে কোন রাজনীতি নেই,নেই দলাদলি। সুবিধা বঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানো ই এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য।কাজেই এদের জন্য যখন কাজ করতে যাই,তখন এই দুখী মানুষ গুলো র কথা চিন্তা করি।এদের সামান্য সহযোগিতা করতে পারলেই অন্যরকম আনন্দ পাই।
প্রশ্ন: যেদিন প্রথম নারী লায়ন্স গভর্নর হলেন, সেদিনের অনুভূতি একটু বলেন?
উত্তর: অবশ্যই অসীম আন ন্দের সেই অনুভূতি। প্রথমেই এক টু ভয় পেয়েছিলাম, এত বিশাল দায়িত্ব সত্যিকার অর্থে পালন করতে পারবো কিনা? কিন্তু একদিকে আমার স্বামী সাবেক লায়ন গভর্নর আবদুল মালেকের সর্বাত্মক সাহস এবং অনুপ্রেরণা,অন্য দিকে ক্লাবের এক্স পিডিজি,ক্লাব মেম্বারদের উৎসাহ আর উদ্দীপনায় আমি এই দায়িত্ব পালন করেছি। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়েছে।প্রতিদিন নিত্য নতুন বিষয় শিখতে হয়েছে। দেশে বিদেশে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। রীতিমতো রুটিন মাফিক কাজ করতে হয়েছে।এমনো সময় গেছে এক দিনে কয়েক টি প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে। তবে আমি এই কাজ করে কখনো ক্লান্ত বোধ করিনি,বরঞ্চ অনেক বেশী বেশী আনন্দিত হয়েছি।আরও একটি মজার বিষয় হলো,আমরা স্বামী স্ত্রী দুজনেই কিন্তু লায়ন্স গভর্ণ র ছিলাম। এটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে এক পরম পাওয়া। আমি মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে সব সময় শুকরিয়া জ্ঞাপন করি।
প্রশ্ন: আপনার শৈশবের, বেড়ে উঠার গল্প শুনতে চাই?
উত্তর : আমার জন্ম আনোয়ারার তৈলারদ্বীপ এর জমিদার বাড়িতে। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু।ম্যাট্রিক পাস করে যখন নাসিরাবাদ গার্লস কলেজে ভর্তি তখন পারিবারিক ভাবেই আমার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়।আমরা কিন্তু বিয়ের আগে কেউ কাউকে দেখিনি। আমার বিয়ের সময় আমার শ্বশুর ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক সাহেব জীবিত ছিলেন না।আমার চাচা শ্বশুর তবিবুল আলমই আমার বিয়ে ঠিক করেন। আলহামদুলিল্লাহ। আমি মালেক সাহেবের মতো একজন জীবন সংগী পেয়েছি।ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের মতো একজন স্বনামধন্য শ্বশুর পেয়েছি ( যদিও দেখিনি), মালেকা বেগমের মতো একজন মহিয়সী শাশুড়ি পেয়েছি।আমার শ্বশুর ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের হাতে প্রতিষ্ঠিত দৈনিক আজাদীর মতো একটি জনপ্রিয় পত্রিকা পেয়েছি।এর থেকে আর সৌভাগ্য কি হতে পারে!
প্রশ্ন:একেবারে উপকূল অঞ্চলের সাগর পাড়ের কন্যা শহরের নাগরিক জীবনে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে পুত্রবধূ হিসেবে এসে কি ভাবে নিজেকে আপনি তৈরি করেছেন,পরিণত হলেন, এক কিংবদন্তি নারীতে, সেই গল্প শুনি খানিকটা?
উত্তর: আগেই বলেছি, আমি অল্প বয়সেই বধূ হয়ে এসেছি।পারিবারিক আর সামাজিক ভাবে ই বিয়ে হয়েছে।বিয়েটা এক ঐশ্বরিক দান। আমার শাশুড়ি বড় পরিবারের কন্যা।তিনি গুণী নারী ছিলেন। আমি উনার কাছ থেকেই শিখেছি। রান্নার শখ আগে থেকেই ছিল। ফলে রান্না বান্না থেকে ঘরকন্না সব কিছুই আমি শিখেছি। আর আমার স্বামী আমাকে সব কিছুতে সহযোগিতা করেছে। আসলে আমার শেখার আগ্রহ ছিল।তাই শিখেছি সব কিছুই। আমার কোন চাহিদা ছিল না।তাই না চাইতেই পেয়েছি অনেক কিছু। প্রত্যাশার চেয়েও প্রাপ্তি অনেক বলা যায়। আর মানুষের বাহ্যিক সুন্দরের কোন মূল্য নেই।সুন্দর হতে হবে অন্তর। অন্তর সুন্দর যার, তার সব,কাজ -ই সার্থক হবে।
প্রশ্ন: আপনার সংসার জীবন, সামাজিক জীবনে রয়েছে বিচিত্র অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা থেকে এই প্রজন্মের মেয়েদের জন্য কিছু বলেন?
উত্তর : আসলে নারী পুরুষ দুই এর জন্য পারিবারিক শিক্ষাটা অত্যন্ত জরুরী।আমরা শ্বশুর বাড়িতে এসে উনাদের মতোই চলেছি।কখনোই কোন বিষয়ে ঝগড়াঝাটি তো দূরের কথা,মুখে তর্কও করিনি।আমাদের স্বামী স্ত্রীতে যে বোঝা পড়া ছিল, সেটি সৃষ্টি কর্তার দান।কারণ পরিবার থেকে শিখে এসেছি, যে সংসার এ যদি অশান্তি করি,সেই প্রভাব পরবে সন্তানদের উপর । তাই সব সময় তো সব কিছু মসৃণ থাকেনা। ভালো মন্দ মিলিয়ে জীবন। মেয়েদের সহ্য শক্তি থাকা একান্ত প্রয়োজন।আজকাল যেটি বিরল হয়ে যাচ্ছে। কি জমকালো আয়োজনে বিয়ে হচ্ছে,অল্প দিনেই ভেঙে যাচ্ছে! এটি হচ্ছে সহ্য ক্ষমতা এবং ধৈর্যের অভাব। মেয়েদের কথা কি বলবো, মেয়েদের মায়েদের ও অনেক সমস্যা। শাসন করেন না।ফলে সমাজে এখন দিন দিন ডিভোর্স এর হার বাড়ছে।এটি কাম্য না।আর একটি বিষয় কেবল অর্থ বিত্ত থাকলেই যে মানুষের মন জয় করা যায় তা সঠিক না,কিছু করতে না পারলেও অন্তত ভালো ব্যবহার দিয়ে, একটু হাসি দিয়েই কথা বললেই মানুষ খুশি হয়ে যায়।আজকাল কার মানুষের মাঝে এসব একেবারে ই নেই।সুন্দর ও শান্তি পূর্ণ জীবন যাপনের জন্য এই মূল্যবোধ গুলোর চর্চা এখন জরুরী হয়ে পড়েছে। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, আত্মীয়তার বন্ধন,মানবিকতা এসবের নিয়মিত চর্চা প্রয়োজন। মানবজীবন ক্ষণ স্থায়ী।আমি কি কাজ করছি, সেটিই থাকবে। যে কয়দিন আছি, সবার সাথে ভালো ব্যবহার করেই যেনো যেতে পারি। যেনো শারিরীক ভাবে সুস্থ থাকি এই টুকুই চাওয়া।
প্রশ্ন:আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা এতক্ষণ সময় দেয়ার জন্য।
উত্তর : আপনি এবং পাঠকদের জন্য শুভকামনা।

