১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদাতবরণ করেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর বিশৃঙ্খলা দমনে এবং খুনিচক্রকে প্রতিহত করতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) আ স ম হান্নান শাহ এক বীরত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন।
নিচে সেই অভিযানের প্রেক্ষাপট ও তাঁর নেতৃত্বাধীন কার্যক্রম আলোচনা করা হলো:
১. অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি:
জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সেই সময় সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ বিভ্রান্ত ছিল। ঢাকা সেনানিবাস ও সেনাসদর থেকে বিদ্রোহীদের দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল।
২. হান্নান শাহর দায়িত্ব ও চট্টগ্রাম অভিযান:
তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আ স ম হান্নান শাহ ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও পেশাদার একজন কর্মকর্তা। সেনাসদরের নির্দেশে তিনি বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণ করাতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
* সরাসরি যোগাযোগ: হান্নান শাহ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং তাদের অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানান।
* সৈন্য পরিচালনা: তিনি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী সেনাবাহিনীর অগ্রবর্তী দলগুলোর সমন্বয় করেন। তাঁর কৌশলী অবস্থানের কারণে বিদ্রোহীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়।
* মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ: তিনি বিদ্রোহীদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, পুরো সেনাবাহিনী এবং দেশের জনগণ এই অভ্যুত্থানের বিপক্ষে। এর ফলে অনেক সাধারণ সৈনিক ও কর্মকর্তা বিদ্রোহ ত্যাগ করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন।
৩. খুনিদের গ্রেপ্তার ও আত্মসমর্পণ:
হান্নান শাহর নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানের চাপে চট্টগ্রামের বিদ্রোহীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
* মেজর জেনারেল মঞ্জুর সেনানিবাস ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর হান্নান শাহ নিশ্চিত করেন যেন সেনানিবাস দ্রুত অনুগত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে।
* হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত অনেককে চিহ্নিত করা এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় সোপর্দ করার প্রাথমিক কাজগুলো তাঁর তদারকিতে সম্পন্ন হয়েছিল।
৪. ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
এই অভিযানে হান্নান শাহর ভূমিকা ছিল মূলত ‘সংবিধান ও শৃঙ্খলা’ রক্ষার। যদি তিনি দ্রুত এবং সাহসের সাথে এই পদক্ষেপ না নিতেন, তবে সেনাবাহিনীতে দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা ছিল। জিয়াউর রহমানের প্রতি তাঁর আনুগত্য এবং পেশাদারিত্ব তাঁকে বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে এক বিশেষ মর্যাদায় সিক্ত করেছে।
ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক প্রভাব:
পরবর্তীতে আ স ম হান্নান শাহ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন এবং দলটির অন্যতম শীর্ষ নেতায় পরিণত হন। বর্তমান প্রজন্মের কাছে তিনি রাজপথের লড়াকু সৈনিক এবং গণতন্ত্র রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে পরিচিত।

