বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

শৈশব স্মৃতিতে শারদীয়া দুর্গাপূজা

রূপম চক্রবর্ত্তী
শঙ্খ নদীর পাশেই ছিল আমাদের গ্রাম।  পুরো এক বছর অপেক্ষা করে থাকতাম কখন দুর্গা পূজা আসবে। তখন তো রেডিমেড শার্ট-প্যান্ট এর এত প্রচলন ছিলনা। কাপড় কিনে দর্জির দোকানে সেলাই করতে হতো। দর্জির দোকানে সেলাই করা শার্ট প্যান্ট পড়ে পূজা মন্ডপে যেতাম। মনে পড়ে,  চতুর্থ থেকে অষ্টম শ্রেণি  পর্যন্ত শুধু একটা শার্ট আর একটা প্যান্ট উপহার নিয়েই পূজা কাটতো। বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। পূজা উপলক্ষে বাবার প্রাপ্ত উৎসব ভাতার দিকে চেয়ে থাকতাম কখন বাবা এই ভাতা পাবেন এবং নতুন কাপড় কিনে দেবেন। আসলে অনেক স্মৃতি সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন কাপড় নিয়ে আরেকটা স্মৃতি খুব মনে পড়ে। যখন বন্ধুদের সাথে পূজা দেখতে যেতাম তখন একজন আরেকজনকে কাপড় নিয়ে কত কথা বলতাম। দুইজন বন্ধুর মাঝে শার্ট প্যান্টের সৌন্দর্য  নিয়ে একটা মৌখিক প্রতিযোগিতাও হয়ে যেত।
মহালয়ার সকাল বেলা রেডিওতে যখন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডীপাঠ শুনতাম তখন শরীরে আলাদা এক অনুভূতি কাজ করত। পূজার আনন্দটা তখন থেকে শুরু হয়ে যেত। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ছাড়া মহালয়ার ভোর কল্পনা করা কোনও বাঙালির পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি চণ্ডীপাঠ না করলে হয়তো বাংলাদেশে দেবী দুর্গার আরাধনা কিছুটা অসম্পূর্ণ থেকে যেত। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় মহালয়া পাঠ  বাঙালির মনে আলাদাভাবে জায়গা করে নিয়েছে। “আশ্বিনের শারদ প্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর…..” এই পাঠ যেন এক শিহরণ জাগিয়ে তোলে। সেই মহালয়া না শুনলে যেন পুজো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মহালয়ার ভোরে যে গীতি আলেখ্য শুনতাম তার সাথে শারদ প্রকৃতি, মাতৃ আবাহন ,শক্তির আরাধনা সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, শ্রোতাকে নিয়ে যায় ভক্তিমার্গেরও উপরের স্তরে আর এটি হয়ে উঠে সংস্কৃতির অনিবার্য উপাদান। মহালয়া উপলক্ষে  বিভিন্ন  মন্দিরে ও পূজামণ্ডপে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়। চণ্ডীপাঠ ছাড়াও মঙ্গলঘট স্থাপন, চণ্ডীপূজা, ঢাক-কাঁসর ও শঙ্খ বাজিয়ে দেবীকে মর্ত্যে আহ্বান জানান ভক্তরা। ভক্তিমূলক সংগীত, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় আলোচনা সভা ছিল দিনের আনুষ্ঠানিকতার অংশ। অনেক ভক্তই এদিন  তাঁদের মৃত আত্মীয়-পরিজন ও পূর্বপুরুষদের আত্মার সদ্‌গতি প্রার্থনা করে তর্পণ করেন। এই মহালয়ার অনুষ্ঠান উপভোগ করা আমার দিনলিপির একটা অংশ ছিল।
যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম তখন তো গ্রামের বাড়িতেই থাকতাম। মাটির ব্যাংকে কিছু টাকা সঞ্চয় করে রাখতাম। সেই সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে কঞ্চি বাজি, তারা বাজি,  শিকবাজি কিনে নিতাম। রিক্সার চাকার শিক দিয়ে তৈরি শিকবাজি ফুটানোতেই পূজার আনন্দ উপভোগ করতাম।
গ্রামের বিদ্যালয়েই পড়তাম।  বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় শিকবাজি বইয়ের ভেতর করে নিয়ে যেতাম। ক্লাস ছুটির পর পূজা বাড়িতে চলে যেতাম। আশীষ পালের মাটির প্রতিমা গড়ার কাজ দেখতাম। মূল পূজার কয়েকদিন আগে থেকেই পূজা মন্ডপের পাশে গিয়ে বসতাম এবং মাঝে মাঝে শিক বাজি আর তারা বাজির আনন্দে হারিয়ে যেতাম। চিন্ময়ী তখন মৃন্ময়ী হিসেবে থাকত।  পূজা কমিটির সদস্যরা চাঁদা তোলার পাশাপাশি মন্ডপে আসতেন এবং মাঝেমধ্যে আমাদের বকাঝোকা করতেন যাতে আমরা দুষ্টমি না করি।
আমরা হারিয়েছি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোরকুমার, মান্না দে, ‘কোকিলকন্ঠী’ লতা মঙ্গেশকর, ‘গীতশ্রী’ সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এবং ‘ডিস্কো কিং’ বাপ্পি লাহিড়িকে।  বাপ্পি লাহিড়ি আর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তো বাঙালির নাড়ির টান, অন্যদিকে লতা মঙ্গেশকর তো ‘সুরের সরস্বতী’। মাইকে লতা মঙ্গেশকরের নির্দিষ্ট  কিছু গান বাজলেই বুজতাম পূজা এসে গেছে। নিজেদের সুরেলা সৃষ্টি দিয়ে বাঙালিকে এক সুতোয় বেঁধেছেন তাঁরা। দুর্গাপুজোয় মণ্ডপে মণ্ডপে তাঁদের গাওয়া না চলা মানে তো আনন্দটাই মাটি হয়ে যাওয়া। আমার শৈশবের পূজার শ্রোতাপ্রিয় গানের তালিকায় রয়েছে লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া ‘আকাশ প্রদীপ জ্বেলে দূরের তারার পানে চেয়ে’, ‘রঙ্গিলা বাঁশিতে’, আশা ভোঁসলের গাওয়া ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’, কিশোর কুমারের ‘একদিন পাখি উড়ে’, মান্না দে’র গাওয়া ‘ললিতা ওকে আজ চলে যেতে বল না’, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ‘ওগো মোর গীতিময়’ শিরোনামের গানগুলো।
শৈশবে মায়ের সাবেকি রূপ দেখে যে ভক্তি আর প্রেম মনের মধ্যে সঞ্চারিত হতো সেই ভক্তির জায়গায় আঘাত আসল বেশ কয়েক বছর আগে।  থিম পূজার নাম দিয়ে পূজার মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় তামসিকতাকে প্রতিষ্ঠা করা হলো।
দেবীমূর্তিতে প্রধানত দু’টি ভাব দেখা যায়৷ একটি রুদ্ররূপ , অন্যটি মৃন্ময়ী রূপ৷ থিম আর সাবেকি প্রতিমার তুলনা করতে গিয়ে  ‘থিম পুজো তো আসলে প্যান্ডেল পুজো৷ ওই প্রতিমা দেখে ভক্তিভাব আসে না৷ সাবেকি প্রতিমা অনেক বেশি জীবন্ত , তার শিকড়ও অনেক গভীরে৷ আমাদের গ্রামের সেই সাবেকি প্রতিমার ছবি আজও চোখের সামনে ভেসে উঠে। বাংলাদেশে দুর্গা পূজায় সরকারি ছুটি বিজয়া দশমীর দিন। ফলে পূজার অন্য চারদিন গ্রামে গিয়ে পূজা উপভোগ করার সুযোগ খুব কম হয়।
বিজয়া দশমীতে মায়ের চরণে অঞ্জলি দেওয়ার পর চৌতিষা পাঠ করতে বসে যেতাম। শান্তির জল মাথায় দেওয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতের শান্তি খুঁজে বেড়াতাম। গ্রামের মেয়েরা
দশমীর দিন সকলে মায়ের পায়ে সিঁদুর দানের মাধ্যমে মাকে বিদায় জানাতেন এবং মেতে উঠতেন সিঁদুর খেলায়।  বিসর্জনের পর সমবয়স্ক দের সাথে আলিঙ্গন, বড়দের প্রণাম ও ছোটদের ভালবাসা জানিয়ে মিষ্টিমুখ, করে আমরা বিজয়া দশমী উদযাপন করতাম। শাস্ত্রমতে, শ্রী রামচন্দ্র সীতাকে রাবণের হাত থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য শরৎকালে অসময়ে দুর্গাপূজা করেছিলেন, যা ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত। রাবণকে পরাজিত করে তিনি সীতাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন ও শ্রীরামচন্দ্র বিজয়ী হয়েছিলেন। সেই থেকেই আবির্ভাব ‘বিজয়া’র। তাই সাধারণ মানুষের কাছে অশুভ শক্তির বিনাশ, মায়ের বিদায় এবং সকল বিষাদের মধ্যে দিয়েও আনন্দে পালিত হয় শুভ বিজয়া। সবমিলিয়ে পুজোর কয়েকটা দিন বেশ ভালোই কেটে যেত । চারিদিকে হইহুল্লোড়, আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া, মজায় দেখতে দেখতে বেশ কেটে যায় কটা দিন। চারিদিক যেন আলোর বন্যায় বেশে যেত সেই অতীতের শৈশব।

এই বিভাগের সব খবর

ফুটবলার ঋতুপর্ণার গৃহ নির্মাণে আর্থিক অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় নারী ফুটবল দলের তারকা খেলোয়াড় ঋতুপর্ণা চাকমার গৃহ নির্মাণে আর্থিক অনুদান দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে বাজেট অধিবেশনের ফাঁকে নিজ...

স্বাস্থ্য, কৃষি ও আইসিটিসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশি শ্রমশক্তি নিয়োগে মরক্কোর প্রতি রাষ্ট্রপতির আহ্বান

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মরক্কোর স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো নির্মাণ, তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্প, আইসিটিসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের দক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমশক্তি নিয়োগে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য...

অনার্স কোর্স থেকে বাংলা ও ইতিহাস বাদ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই: শিক্ষামন্ত্রী

অনার্স কোর্স থেকে বাংলা, দর্শন ও ইতিহাসের মতো মৌলিক বিষয়গুলো বাদ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন...

সর্বশেষ

ফুটবলার ঋতুপর্ণার গৃহ নির্মাণে আর্থিক অনুদান দিলেন প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় নারী ফুটবল দলের তারকা খেলোয়াড় ঋতুপর্ণা চাকমার গৃহ...

স্বাস্থ্য, কৃষি ও আইসিটিসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশি শ্রমশক্তি নিয়োগে মরক্কোর প্রতি রাষ্ট্রপতির আহ্বান

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মরক্কোর স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো নির্মাণ, তৈরি...

অনার্স কোর্স থেকে বাংলা ও ইতিহাস বাদ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই: শিক্ষামন্ত্রী

অনার্স কোর্স থেকে বাংলা, দর্শন ও ইতিহাসের মতো মৌলিক...

বাজেটে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব

দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, যুবসমাজের...

ফাইভজি ও রোবটিকস: অনাগত ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত বিপ্লব

বর্তমান পৃথিবী প্রযুক্তির এক অভাবনীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।...

অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৫ রানের লক্ষ্য দিল বাংলাদেশ

তিন ব্যাটার তানজিদ হাসান-নাজমুল হোসেন শান্ত ও মোসাদ্দেক হোসেনের...