বাংলাদেশে ভোটের যুদ্ধের অনেকটাই মূলত প্রতীককে ঘিরে।আওয়ামী লীগের নৌকা,বিএনপির ধানের শীষ ও জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকেই পরিচিতি।পরিসংখ্যান, ভোটের লড়াইয়ে সাফল্য ও ঐতিহাসিকতার প্রেক্ষাপট মিলিয়ে বাংলাদেশের মানুষের কাছে সবচাইতে প্রিয় ও আবেগের প্রতিক হলো “নৌকা”।অনেকেই জানিনা নৌকা কেমন করে আওয়ামী লীগের প্রতীক হলো? নতুন প্রজন্মের জন্য ” নৌকা”র সাথে আওয়ামী লীগের সেতুবন্ধ সৃষ্টির ঘটনা জানতে চলুন ডুব দেই ইতিহাসে।

নৌকা যেভাবে প্রতীক হলো:- ১৯৫৩ সালের কথা।বাংলাদেশ তখন পূর্ব পাকিস্তান। প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনের জন্য পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক দল আওয়ামী মুসলিম লীগ,কৃষক শ্রমিক পার্টি,পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল, পাকিস্তান খেলাফত পার্টি,পশ্চিমের মাওলানা আতাহার আলীর নেজামে ইসলাম পার্টি, বামপন্থী গণতন্ত্রী দল ও খেলাফত ই রাব্বানী দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় “যুক্তফ্রন্ট”।১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে ” নৌকা”প্রতিক নিয়ে ভোটের লড়াইয়ে নেমে বাজিমাত করে যুক্তফ্রন্ট। সেই সময় যুক্তফ্রন্টের সবচেয়ে বড় শরিক দল ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ।তথা আজকের আওয়ামীলীগ।প্রাদেশিক পরিষদের সেই নির্বাচনে ২৩৭ আসনের লড়াইয়ে নৌকা নিয়ে ২২৩টি আসনে জয়ী হয় যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীরা।শরিকদের মধ্যে মাওলানা ভাসানী নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মুসলিম লীগ পায় ১৪৩টি আসন,শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক পার্টি পেয়েছিলো ৪৮ টি আসন,নেজামে ইসলাম ২২টি,বামপন্থী গনতন্ত্রী দল ১৩টি ও খেলাফত ই রাব্বানী পায় দুটো আসন। একসময় যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যায়।মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে আওয়ামীলীগের জন্ম হয় তরুণ শেখ মুজিবের দূরদর্শী ভাবনা থেকে।তখনই জানানো হয় আওয়ামীলীগের প্রতীক হবে “নৌকা”।
জন্মের ১৩ বছর পর প্রথমবার নৌকা নিয়ে ভোটের লড়াইয়ে নামে আওয়ামীলীগ।হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন,১৯৭০ সালের সাধারন পরিষদ নির্বাচনের কথাই বলছি। পাকিস্তান সাধারণ পরিষদের সেই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ নৌকা প্রতিক নিয়ে ১৬০ টি আসনে জয়ী হয়ে পাকিস্তানের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। তবে ” নৌকা” আওয়ামীলীগের প্রতিক হওয়ার নেপথ্যে বাংলাদেশের প্রকৃতি,এ দেশের মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে দেয় নৌকাকে।নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের প্রধান বাহন ছিলো নৌকা।আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মাঝে উদ্ভাবনী শক্তি ও দূরদর্শিতা প্রকাশ ঘটেছিলো খুবই অল্প বয়সে।ইতিহাস সাক্ষী দেয় তেমনই এক ঘটনার। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষে গোপালগঞ্জে সাহায্য আনার জন্য মুসলিম লীগের জাতীয় নেতাদের নিয়ে নিজের এলাকায় একটা সম্মেলনের আয়োজন করেন তরুণ শেখ মুজিব।বড় বড় নৌকার বাদাম দিয়ে সেই সম্মেলনের প্যান্ডেল তৈরী করেছিলেন তিনি।নৌকার বাদাম দিয়েও অনুষ্ঠানের প্যান্ডেল হতে পারে,তরুন মুজিবের সেই উদ্ভাবনী শক্তি দেখে অভিভূত হয়েছিলেন তৎকালীন সিনিয়র নেতৃবৃন্দ।একটু ভাবলেই স্পষ্ট হয়ে যায়,এমনি এমনিতেই” বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু “ইতিহাসে অমরত্ব পেয়ে যায়নি।আপনি চাইলে সঙ্গে নৌকা জুড়ে দিলেও অত্যুক্তি হবেনা মোটেই।
আর সৃষ্টিকর্তার কি চমৎকার চিত্রনাট্য দেখুন,৭৫ এর ১৫ ই আগষ্ট ট্র্যাজেডী থেকে তিনি বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়েকে সযত্নে সরিয়ে রেখেছিলেন।সৃষ্টিকর্তার খেয়ালই ছিলো, বঙ্গবন্ধু কন্যা আর নৌকার মাধ্যমেই বাংলাদেশ একদিন অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করবে।যা আজকের বাস্তবতা হয়ে দৃশ্যমান বাংলাদেশে। ওনার খেয়ালই আজ ৭ জানুয়ারী বাংলাদেশের মানুষের কাছে নৌকা নিয়ে দাঁড়িয়ে অবশিস্ট কাজটুকু শেষ করার ম্যান্ডেট নিতে।বলাই বাহুল্য,বাংলাদেশের মানুষ শেখ হাসিনাকে সেই ম্যান্ডেট অনেক আগেই দিয়ে রেখেছেন।আজ কেবলই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন বাংলাদেশের মানুষ। (ইতিহাসের সাগর সেঁচে মুক্তো তোলার এই প্রতিবেদন তৈরীতে অগ্রজপ্রতিম সাংবাদিক,ভয়েস অফ আমেরিকার বাংলাদেশ প্রতিনিধি,প্রিয়মুখ প্রনব চক্রবর্তী(প্রনব দা)কে কৃতজ্ঞতা জানাই কিছু তথ্য দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করার জন্য)

