ইতিহাসের রাখাল রাজা,সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জানা সহজ কম্ম নয়। কিন্তু এই প্রজন্মের জন্য আমার সীমিত জ্ঞান থেকে আমি চেষ্টা করবো জাতির পিতাকে জানতে ও জানাতে।গতকাল ৮ ইআগষ্ট ছিলো তৃতীয় পর্ব। আজ থাকছে এই প্রচেষ্টার চতুর্থ পর্ব। আগষ্ট জুড়ে ধারাবাহিক ভাবে স্লোগান অনলাইনে এটি নিয়ে আসবো ইনশাআল্লাহ।
১৯৬২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী বঙ্গবন্ধুকে জননিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয়।১৮ জুন জেল থেকে মুক্তি লাভ করেন তিনি। ৫ ই জুলাই ১৯৬২ তারিখে পল্টনে বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু আইয়ূব খাঁনের কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন। ঐ বছরের ২৪শে সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু লাহোর যান।সেখানে হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে বিরোধী দলীয় মোর্চা জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠিত হয়।অক্টোবর মাস জুড়ে বঙ্গবন্ধু ও হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী সারা বাংলায় ব্যাপক গণসংযোগ করে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। ১৯৬৩ সালে হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান।বঙ্গবন্ধু তাঁর সঙ্গে পরামর্শের জন্য লন্ডন যান। ৫ ডিসেম্বর ১৯৬৩ ইং হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী বৈরুতে ইন্তেকাল করেন।
১৯৬৪ সালের ২৫শে জানুয়ারী বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে আওয়ামীলীগকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়।সভায় মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশকে দলের সভাপতি ও বঙ্গবন্ধুকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হয়। বঙ্গবন্ধু ঐ বছরই লন্ডন সফরে যান কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার খবর পেয়ে দ্রুত দেশে ফিরে আসেন।সারাদেশে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়।বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়। দাঙ্গা কমে এলে বঙ্গবন্ধু আইয়ূব বিরোধী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দেন।সে বছরে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়ূব খাঁনের বিরুদ্ধে বেগম ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে সম্মিলিত বিরোধী জোট ‘কপ’ গঠনে বঙ্গবন্ধু অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।নির্বাচনে ভোটগ্রহণের ১৪ দিন আগে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৫ সালে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে বঙ্গবন্ধুকে এক বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।পরবর্তীতে হাইকোর্টের নির্দেশে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।
ঐতিহাসিক ছয়দফা:- বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১৯৬৬ সালটি ঐতিহাসিক বছর হিসেবে চিন্হিত হয়ে আছে।এ বছরের ৫ ফেব্রুয়ারী লাহোরে বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনের বিষয় নির্বাচনী কমিটিতে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ছয়দফা দাবি পেশ করেন।প্রস্তাবিত ছয়দফা ছিলো বাঙালী জাতীর মুক্তির সনদ। ১৮ মার্চ তারিখে বঙ্গবন্ধু আওয়ামীলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।তিনি ছয়দফার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে সারা পূর্ব বাংলায় ব্যাপক গণসংযোগ করেন।সেই সময় সিলেট,যশোহর,ময়মনসিংহ ও ঢাকা সহ বিভিন্ন স্থানে তাঁকে বারবার গ্রেফতার করা হয়।বঙ্গবন্ধু ঐ বছরের প্রথম তিনমাসে আটবার গ্রেফতার হন।৮ মে নারায়ণগঞ্জ পাটকল শ্রমিকদের জনসভায় বক্তৃতা শেষে তাঁকে পূনরায় গ্রেফতার করা হয়।সেবার বঙ্গবন্ধু একনাগাড়ে প্রায় তিন বছর কারাবাস করেন। ৭ই জুন বঙ্গবন্ধু ও আটক অন্য নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে ও ছয়দফার সমর্থনে সারাদেশে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়।ধর্মঘটের দিন ঢাকার তেজগাঁও, নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গীতে পুলিশের গুলিতে মনু মিয়া সহ বেশ কয়েকজন নিহত হন। এই দিনেই ছয়দফা বাংলাদেশের মহাসনদ বা ম্যাগনাকার্টা পরিণত হয়।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা:- ১৯৬৮ সালের জানুয়ারীর ৩ তারিখে পশ্চিমা সরকার বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামী করে বাঙালী সেনা ও সিএসপি অফিসার সহ মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ এনে প্রহসনের “আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ” দায়ের করা হয়।সারাদেশে শ্লোগান ওঠে,জেলের তালা ভাঙবো,শেখ মুজিবকে আনবো। ১৭ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধুকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে পূনরায় জেল গেইট থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে আটকে রাখা হয়। ১৯শে জুন ঢাকা সেনানিবাসে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামীদের বিচার কাজ শুরু হয়।বঙ্গবন্ধু তাঁর জবানবন্দীতে যে বিবরণ তুলে ধরেন তা অত্যন্ত সাহসী,দৃঢ় ও স্বাধীনচেতা রাজনৈতিক নেতার পরিচয় প্রকাশ করে। নভেম্বর নাগাদ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বিরোধী আন্দোলন আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনে রুপ নেয়। আন্দোলন মহা অভ্যুত্থানে রুপ নিলে আইয়ুব খান তাঁর মৌলিক গণতন্ত্রের ব্যর্থতা স্বীকার করে ১ লা ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯ সালে জাতীয় সংকট সমাধানে গোল টেবিল বৈঠক ডাকলেন। ১৪ ই ফেব্রুয়ারী তিনি বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে ছাড়বার ব্যবস্থা নিলেও জনতার দাবী ছিলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা খারিজ করতে হবে। বঙ্গবন্ধু প্যারোলে বেরুতে অস্বীকৃতি জানান। ২২শে ফেব্রুয়ারী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হলে টানা ৩৪ মাস কারাভোগের পর বঙ্গবন্ধু মুক্তি লাভ করেন।
বঙ্গবন্ধু উপাধি লাভ:- সেই বছর তথা ১৯৬৯ সালের ২৩ শে ফেব্রুয়ারী রেসকোর্স ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে শেখ মুজিবুর রহমানকে গণসংবর্ধনার আয়োজন করা হয়।দশ লক্ষাধিক ছাত্র জনতার সেই ঐতিহাসিক সংবর্ধনায় অনুষ্ঠানের সভাপতি ও ডাকসুর তৎকালীন ভিপি তোফায়েল আহমেদের প্রস্তাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সেদিন থেকেই তিনি বাঙালী জাতির নিকট বঙ্গবন্ধু হয়ে গেলেন। (ক্রমশঃ)

