পহেলা বৈশাখকে বরণে উৎসবের রঙ লেগেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। দিকে দিকে বৈশাখের জয়গান। বৈশাখ আবারও দিয়েছে চির সম্মিলনের বার্তা।
মঙ্গলের আবাহনে বের হওয়া বর্ণিল শোভাযাত্রায়ও ঘটেছে আপামর মানুষের সম্মিলন। ধর্মান্ধতা, হিংসা-বিদ্বেষ, গ্লানি ঝেড়ে আবহমান বাংলার সর্বজনীন সংস্কৃতিকে রক্ষার তাগিদ এসেছে মঙ্গল শোভাযাত্রায়।
বরাবরই চট্টগ্রামে বর্ষবরণের বড় দু’টি আসর বসেছিল সিআরবির শিরীষতলা ও ডিসি হিলে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শিল্পকলা একাডেমিতে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও সবুজ চত্বরেও ছিল প্রাণের মেলা। অন্যদিকে, নগরীর চবি’র চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা, চারুশিল্পী সমন্বয় পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করেছে। তবে রমজানের কারণে প্রতিটি আয়োজনই এবার সংক্ষিপ্ত পরিসরে করা হয়েছে।
কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরপুর ছিল প্রতিটি আয়োজন। কাঠফাটা রোদ আর তীব্র গরমের মধ্যেও জনসমাগমের কমতি ছিল না বর্ষবরণের আসরগুলোতে। নতুন শাড়ি, নতুন পাঞ্জাবি জড়িয়ে অলি-গলিতে সরব পদচারণা উৎবসপ্রিয় বাঙালির। শিশু কিশোর, তরুণ তরুণী, বৃদ্ধরাও নববর্ষের অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
সকাল সাড়ে ৭টায় সিআরবির শিরীষতলায় সাংস্কৃতিক সংগঠন শীলা দাশগুপ্তার সঞ্চালনায় ভায়োলিনিস্ট চিটাগংয়ের বেহালা বাদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বর্ষবরণের পঞ্চদশ আয়োজন। নববর্ষ উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রামের উদ্যোগে এই আয়োজনে রবীন দে সঙ্গীত বিদ্যালয়, সঙ্গীত ভবন, সুরাঙ্গন বিদ্যাপীঠ, সুর সাধনা সঙ্গীতালয়, বাংলাদেশ রেলওয়ে সাংস্কৃতিক ফোরাম, উদীচী চট্টগ্রাম, স্বরলিপি সাংস্কৃতিক ফোরাম, সৃজামী, অদিতি সঙ্গীত নিকেতনসহ বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পীরা সম্মিলিত গান পরিবেশন করেন। বোধন আবৃত্তি পরিষদ, প্রমা আবৃত্তি সংগঠন, শব্দনোঙ্গর, তারুণ্যের উচ্ছ্বাসসহ কয়েকটি সংগঠনের শিল্পীরা বৃন্দআবৃত্তি পরিবেশন করেন। ওড়িষি অ্যান্ড টেগোর ডান্স মুভমেন্ট সেন্টার, নৃত্যনীড়, রাগেশ্রীসহ বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করেন।
নববর্ষ উদযাপন পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক একুশে পদকপ্রাপ্ত ড. মনিরুজ্জামানকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে বর্ষবরণের মঞ্চে।
সিএমপির পক্ষ থেকে সিআরবির শিরীষতলার অন্তত এক কিলোমিটার দূরে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্রের সামনে প্রতিবন্ধক দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। সিআরবিতে প্রবেশের তিন দিকেও গাড়ি প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে শিরীষতলায় যেতে লোকজনকে গরমের মধ্যে হেঁটে পথ পাড়ি দিতে হয়েছে অনেকদূর। এ নিয়ে মানুষের মধ্যে ভোগান্তিও ছিল। বিশেষ করে যেসব শিল্পীরা মঞ্চে অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন, তাদেরও পায়ে হেঁটে যেতে হয়েছে।
নগরীর ডিসি হিলের মুক্তমঞ্চে সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে শুক্রবার সকাল ৭টায় জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বর্ষবরণের আয়োজন। ছন্দানন্দ সাংস্কৃতিক পরিষদ, গুরুকুল সংগীত একাডেমি, নটরাজ নৃত্যাঙ্গন একাডেমি, গুরুকুল, ঘুঙুর নৃত্যকলা কেন্দ্র, সঞ্চারী নৃত্যকলা একাডেমি, নৃত্য নিকেতন, দি স্কুল অব ফোক ডান্স, বোধন আবৃত্তি পরিষদ, প্রমা আবৃত্তি সংগঠন, স্বরনন্দন প্রমিত বাংলা চর্চা কেন্দ্রসহ ৩২টি সংগঠনের শিল্পীরা সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশনেন। বেলা ১২টায় অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানেন আয়োজকরা।
চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি থেকেও বর্ষবরণ উপলক্ষে সকালে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। শিল্পকলার অনিরুদ্ধ মুক্তমঞ্চে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শিশু একাডেমি, ফুলকিসহ নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও বর্ষবরণের অনুষ্ঠান হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও সংস্কারকাজের জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট এবার নগরীতে মঙ্গল শোভাযাত্রা ও বর্ষবরণের অনুষ্ঠান বাতিল করে। তবে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বাইরে নিজ উদ্যোগে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করে। সেই শোভাযাত্রার ব্যানার এবং শিক্ষার্থীদের বানানো প্রতিকৃতিগুলো ছিল সাদা-কালো।
ঢোলবাদ্যের তালে তালে এগিয়ে যাওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা নগরীর বাদশা মিয়া সড়ক থেকে চট্টেশ্বরী রোড হয়ে কাজির দেউড়ি ঘুরে চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে এসে শেষ হয়। একইস্থান থেকে চারুকলার সাবেক শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘চট্টগ্রাম চারুশিল্পী সম্মিলন’ মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। উদীচীর পক্ষ থেকে নগরীর আন্দরকিল্লা থেকে বের হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা ডিসি হিলে গিয়ে শেষ হয়।

