চলতি বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ চালূ হতে যাচ্ছে দোহাজারী-কক্সবাজার,খুলনা- মোংলা ও ঢাকা- ভাঙ্গা রোডের নতুন ২৪৫ কিলোমিটার রেলপথ চালু হতে যাচ্ছে।
নতুন লাইনে ট্রেন পরিচালনায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে ২ হাজার ৮৯৩ জন লোকবলের চাহিদার কথা জানিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। তবে এখনও জনবল নিয়োগের বিষয়টি অনুমোদন না হওয়ায় যাত্রীসেবা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
সরকারী উচ্চপর্যায়ে একটি সূত্র বলছে, এ বছরের ডিসেম্বর বা ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। তার আগেই জনগণের সামনে নিজেদের অর্জন তুলে ধরতে চায় রেলপথ মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে এ নিয়ে কথা বলেন রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন। এ সময় আগামী জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন রেললাইনগুলো চালুর জন্য প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লোকবল অনুমোদনের বিষয়টি এখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হাতে। আর শিগগিরই অনুমোদন দিলেও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষাসহ আনুষঙ্গিক যেসব কাজ বাকি আছে সেগুলো নির্বাচনের আগে সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে রেললাইন উদ্বোধন হলেও সেবা দেওয়া দুরূহ হবে।
তিন প্রকল্পের ২৪৫ কিলোমিটার রেললাইনের মধ্যে ঢাকা-ভাঙ্গা রুটের দৈর্ঘ্য ৮০ কিলোমিটার। খুলনা-মোংলা রুট ৬৫ কিলোমিটার এবং দোহাজারী-কক্সবাজার রুট ১০০ কিলোমিটার।
পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্পের (ঢাকা-ভাঙ্গা-যশোর রুট) কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে। প্রাথমিকভাবে এই রুটটি ভাঙ্গা পর্যন্ত নির্মিত হচ্ছে। এই প্রকল্পে পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগ, যান্ত্রিক বিভাগ, সিগন্যালিং ও টেলিকম বিভাগ, নিরাপত্তা বিভাগ এবং বৈদ্যুতিক প্রকৌশল বিভাগের জন্য জনবল চাওয়া হয়েছে। এখানে মোট ১ হাজার ৬৮০ জন লোকবলের প্রস্তাব করা হয়েছে। ৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ খুলনা-মোংলা বন্দর রেলপথ প্রকল্পে ৫৭৭ জন এবং দোহাজারী-কক্সবাজার প্রকল্পে ৬৩৬ জন লোকবলের চাহিদা দেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্র বলছে, স্টেশন মাস্টার, গার্ড, টিকিট সংগ্রাহক, ট্রেন কন্ট্রোলার, খালাসি, ভ্রাম্যমাণ টিকিট পরিদর্শকসহ অন্যান্য জনবল চাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে আরও চার বছর আগে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘জুন ও সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন তিনটি রেলপথ চালুর একটা তাগাদা আছে। কিন্তু জনবল অনুমোদন হয়নি। জনপ্রশাসনের একটা মানসিকতা থাকে কোনো না কোনো প্রশ্ন দিয়ে প্রস্তাব ফেরত পাঠানোর।’
তিনি বলেন, ‘এ সমস্যা সমাধানে অন্য জায়গা থেকে কিছু লোক নিয়ে আসা হয়। যেসব স্থান থেকে লোক আনা হয়, সেসব জায়গায় সেবায় ঘাটতি হয়। যেকোনোভাবে উদ্বোধন করে তারপর কিছু অস্থায়ী লোকজন দিয়ে চালানো হয় আর কী। আসলে লোকবল অনুমোদন হওয়া দরকার। পরিচালনায় শৃঙ্খলা ও ভালো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এটা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের সঙ্গেই অনুমোদন হওয়া দরকার। কিন্তু এটা কখনো হচ্ছে না।’
এই কর্মকর্তা জানান, এমনিতেই তাদের জনবলের বিশাল ঘাটতি রয়েছে। সেই ঘাটতি পুষিয়ে নতুন করে সেবা দেওয়া কঠিন হবে।
ঢাকা-ভাঙ্গা রেলপথ নির্মাণকাজের ৮৮ শতাংশ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। গত ১০ জানুয়ারি নির্মাণকাজ পরিদর্শন করেন রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। এ সময় আগামী জুনের মধ্যে পদ্মা সেতু দিয়ে ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করবে বলে জানান তিনি।
খুলনা মোংলা বন্দর রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক আরিফুজ্জামান জানান, মোট ৯টি স্টেশনসহ খুলনা থেকে মোংলা পর্যন্ত ব্রডগেজ লাইনের নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৯৬ ভাগ। কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা আগামী জুন মাস। এরপর যেকোনো সময় উদ্বোধন হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের চাহিদাটা পাঠিয়েছিলাম রেলওয়ের মহাপরিচালকের দপ্তরে। সেখান থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয় হয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যায়। তারা একটি প্রশ্ন দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে। আমরা জবাব দিয়ে ডিজির দপ্তরে পাঠাই। এরপর এটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে গিয়েছে কি না, আমি সঠিক বলতে পারছি না।’
দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের লোকবল নিয়োগে এখনও সরকারি অনুমোদন পাওয়া যায়নি। প্রস্তাবটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। অনুমোদন পেলে নিয়োগে যেতে পারব। তবে নিয়োগ যেহেতু সময়সাপেক্ষ, তাই আমাদের যে লোকবল আছে তাদের দিয়েই কাজ চালাব। যখন আমরা সরকারি অনুমোদন পাব তখন শূন্য পদগুলো পূরণ হবে।’
তিনি জানান, দোহাজারী থেকে ৯টি স্টেশনসহ কক্সবাজারে মোট ১০০ কিলোমিটার রেলপথ আগামী সেপ্টেম্বরে উদ্বোধনের উপযোগী হবে। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের কাজে অগ্রগতি ৮০ শতাংশ।
মফিজুর রহমান বলেন, ‘আমার ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময় আছে। কিন্তু আমরা তো চাই দ্রুত শেষ করতে। দ্রুত শেষ করলে ব্যয় কমানো যায়। যেহেতু নির্বাচিত সরকার তারা চাইবেই আগে (নির্বাচনের) শেষ করতে। সরকারি কর্মকর্তাদের দেশের জন্য কমিটমেন্ট হলো, দ্রুত শেষ করা। শেষ করতে পারলে জনগণ সুফল পাবে।’
চরম জনবল সংকটের মাঝে নির্বাচনের আগে তিনটি নতুন রেলপথ চালু করা সম্ভব হবে কি? এমন প্রশ্ন ছিল রেলওয়ের মহাপরিচালক কামরুল আহসানের কাছে। উত্তরে তিনি বলেন, ‘নতুন রেলপথ চালুর সঙ্গে সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য লোক লাগবে না। আমাদের অপারেশন, সিকিউরিটি ও সিগন্যালিং কাজের লোক লাগবে। যেমন স্টেশন মাস্টার, পয়েন্টস ম্যান ও খালাসি; এ ধরনের লোকজন লাগবে। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বর্তমান জনবল থেকে নিয়ে ট্রেন চালাব।’
তিনি বলেন, ‘দ্রুত শেষ করার তাড়া আছে। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে আমাদের কোনো তাড়া নেই। আর আমরা তো আগেও দুইটি লাইন স্থায়ী জনবল এনে চালু করেছি। সমস্যা হয়নি।’
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের (ঢাকা-ভাঙ্গা-যশোর রুট) কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। খুলনা-মোংলা রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প শুরু হয় ২০১০ সালের ডিসেম্বরে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ২৬০ কোটি ৮৮ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। দোহাজারী-কক্সবাজার সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১০ সালের ডিসেম্বরে। এটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা।

