দলমতের বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে সব মুক্তিযোদ্ধাকে আওয়ামী লীগ সম্মান দিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানানোকে আওয়ামী লীগ কর্তব্য মনে করে।
বুধবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘বীর নিবাস’ প্রকল্পের আওতায় পাঁচ হাজার অসচ্ছ্বল বীর মুক্তিযোদ্ধাকে নিজস্ব জমিতে একতলা বাড়ির চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে এমন মন্তব্য করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি এই কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা জাতির জন্য লজ্জার। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ফিরিয়ে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর।
৭৫ পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধারা অবহেলিত ছিলেন জানিয়ে শেষ হাসিনা বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দেখানোকে আওয়ামী লীগ কর্তব্য মনে করে।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু মুক্তিযোদ্ধারা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারা দিয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন; তাই দেশে ফিরে তাদের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেন। আমাদের এ যুদ্ধটা জনযুদ্ধ ছিল, এখানে যারা মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং আমাদের সশস্ত্রবাহিনী, পুলিশ এবং আনসার বাহিনী ছাড়াও আরও যারা ছিলেন, তারা এ দেশের আপামর জনসাধারণ ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর কথায় যার যা ছিল তাই নিয়েই কিন্তু শত্রুর মোকাবিলা করেছিলেন তারা। এই ধরনের যুদ্ধ কিন্তু কমই দেখা গেছে, যেটা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারা দিয়ে এ দেশের মানুষ করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ফিরে এসে তাদের কল্যাণে একটি ট্রাস্ট গঠন করে দেন বঙ্গবন্ধু। ওই সময় যেসব শিল্প কলকারখানা পাকিস্তানিদের মালিকানায় ছিল, তারা ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল, সেগুলো সরকারিকরণ না করে তার মধ্যে থেকে ৩২টি শিল্পকল কারখানা ও আরও অনেক প্রতিষ্ঠান দিয়ে দেন তাদের। কারণ এর থেকে যে আয় হবে তা দিয়ে যেন মুক্তিযোদ্ধারা চলতে পারেন তার ব্যবস্থা করে দিয়ে যান তিনি। কিন্তু দুভার্গ্যজনক হলেও সত্য বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সেই সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো অলাভজনক হয়ে যায়, লুটপাটের আখড়া হয়ে দাঁড়ায়। মুক্তিযোদ্ধারা আসলে যে মুক্তিযোদ্ধা, এই কথাটি মানুষের মাঝ থেকে ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। জাতির পিতার নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হয়।
তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা মারা গেলে তারা যেন সম্মান পান, সেই ব্যবস্থা করেছি। জাতির পিতা যেমন তাদের সন্তানদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, নির্যাতিত মা-বোনদের জন্য একটা কোটা সিস্টেমের ব্যবস্থা করেছিলেন, আমরা সরকারে আসার পর শুধু মুক্তিযোদ্ধা না, তাদের সন্তান ও বংশপরম্পরায় যারা আসবে তারাও যেন প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রায় সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার ব্যবস্থা করেছি। ন্যূনতম ভাতা এখন ২০ হাজার টাকা করেছি। তা ছাড়া অনেকের ঘর নেই, বাড়ি নেই, মানবেতর জীবনযাপন করছে; এটা আমাদের জন্য লজ্জার ব্যাপার। একজন মুক্তিযোদ্ধা ভিক্ষা করবে বা রিকশা চালাবে অত্যন্ত আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা যখন ক্ষমতায় তখন এটা হতে পারে না। সে জন্য আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ঘরবাড়ি তৈরি করেছি, জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা এবং তাদের জন্য বৈশাখী ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতার ব্যবস্থা করে দিয়েছি।’
এর আগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঁচ হাজার অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে বীর নিবাসের চাবি হস্তান্তর কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন সরকারপ্রধান।
প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধক্রমে তার পক্ষে প্রথমে নড়াইলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবদুস সবুরের হাতে বীর নিবাসের চাবি হস্তান্তর করেন জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান।
যেসব জেলায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি হস্তান্তর করা হচ্ছে তার মধ্যে ঢাকায় ৫৭, গাজীপুরে ৩৮, মানিকগঞ্জে ৫১, নরসিংদীতে ৩৯, নারায়ণগঞ্জে ৩২, মুন্সীগঞ্জে ৬, টাঙ্গাইলে ২০২, কিশোরগঞ্জে ১০৪, ফরিদপুরে ১২০, গোপালগঞ্জে ৫১, রাজবাড়ীতে ৫৮, শরীয়তপুরে ১২৫, মাদারীপুরে ৪৫, চট্টগ্রামে ৭৮, কক্সবাজারে ১৭, রাঙামাটিতে ৩, খাগড়াছড়িতে ৪৫, বান্দরবানে ৮, কুমিল্লায় ১৮৬, চাঁদপুরে ৮১, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৩০, নোয়াখালীতে ৬৪, ফেনীতে ৮১, লক্ষ্মীপুরে ৩৬, বরিশালে ৬৭, ভোলায় ৯৮, পিরোজপুরে ৮১, পটুয়াখালীতে ৪২, বরগুনায় ৩৯, ঝালকাঠিতে ৩০, খুলনায় ৮৮, বাগেরহাটে ২৭৫, সাতক্ষীরায় ১০১, যশোরে ৭৫, মাগুরায় ৩৫, ঝিনাইদহে ১৩৩, নড়াইলে ৭৭, কুষ্টিয়ায় ১৭৯, চুয়াডাঙ্গায় ৯১, মেহেরপুরে ৪৬, রাজশাহীতে ৭২, নওগাঁয় ৮০, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪১, নাটোরে ৪৩, বগুড়ায় ৬৯, জয়পুরহাটে ৫২, পাবনায় ৯৯, সিরাজগঞ্জে ৭১, দিনাজপুরে ৯৮, ঠাকুরগাঁওয়ে ৩৮, পঞ্চগড়ে ৫৯, নীলফামারীতে ২২, রংপুরে ৬৫, গাইবান্ধায় ৯৩, লালমনিরহাটে ৩৬, কুড়িগ্রামে ৪১, ময়মনসিংহে ১৯১, নেত্রকোনায় ১২৬, জামালপুরে ৯৮, শেরপুরে ১০৬, সিলেটে ১৯, মৌলভীবাজারে ৫৯, হবিগঞ্জে ৫০ ও সুনামগঞ্জে ১৪৮টি বাড়ি রয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মুজিববর্ষ এবং স্বাধীনতার সুর্বণজয়ন্তী উপলক্ষে ২০২১ সালে সারাদেশে ৩০ হাজার বীর নিবাস নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করে সরকার। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। এ পর্যায়ে পাঁচ হাজার বাড়ি নির্মাণ শেষে হস্তান্তর করা হচ্ছে। বাড়িতে দুই বেডরুম, একটি ড্রইং ও একটি ডাইনিং, দুটি বাথরুম এবং একটি বারান্দা রয়েছে। চার শতাংশ জমিতে ৭৩২ বর্গফুট আয়তনের এক-একটি বাড়ির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ১০ হাজার ৩৮২টাকা।

