চট্টগ্রাম নগরীতে শিশু আলীনা ইসলাম আয়াতকে খুনের পর কেটে ছয় টুকরো করে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার ঘটনায় আবির আলীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোঃ হাসিবকে গ্রেফতারের পর আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। আয়াতকে অপহরণের পরিকল্পনা থেকে হত্যাকাণ্ড সবই আবির তাকে জানিয়েছিল বলে তথ্য দিয়েছে এই হাসিব।
আজ বুধবার বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম মেহনাজ রহমান গ্রেফতার হাসিবের পাঁচ পৃষ্ঠার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন আয়াত খুনের রহস্য উদঘাটনে গঠিত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) টিমের পরিদর্শক ইলিয়াস খান।
১৭ বছর বয়সী কিশোর হাসিব নগরীর ইপিজেড থানার বন্দরটিলা নয়ারহাট এলাকায় আয়াতের বাসার অদূরে ‘ভাই ভাই হোটেলের’ মেসিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিল। একই এলাকার সাইফুল কলোনিতে ব্যাচেলর বাসায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতো।
পিবিআই পরিদর্শক (মেট্রো) ইলিয়াস খান জানিয়েছেন, আবির আলীকে গ্রেফতারের পর তার ঘনিষ্ঠ কিশোর হাসিবকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। তখন সে প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্য দিলেও আবির আলীকে গ্রেফতার করে ঘটনার পুরো রহস্য উন্মোচনের পর হাসিব সার্বিক বিষয় অবগত থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হয় পিবিআই টিম। এরপর মঙ্গলবার দুপুরে বাসার সামনে থেকে হাসিবকে গ্রেফতার করা হয়।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতার হাসিব জবানবন্দিতে জানিয়েছে- বয়স এক-দেড় বছর কম হলেও শৈশব থেকেই আবির তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তবে তাকে ‘আবির ভাই’ বলে ডাকত। গত অক্টোবর মাসের শুরুর দিকে একদিন ওই এলাকায় নেভি গেটের পাশে নালার প্রতিরোধ দেয়ালের ওপর বসে আড্ডার সময় আবির তাকে জানায়- নয়ারহাট এলাকায় মনজুর বিল্ডিংয়ের (যে বাসায় আবিরের জন্ম এবং মায়ের সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর তার বাবা এখনও যে বাসায় ভাড়া থাকেন) মালিক মনজুরের নাতনি আয়াতকে অপহরণ করে মেরে ফেলবে আর তার দাদার কাছ থেকে মুক্তিপণের টাকা নেবে। আবির তাকেও এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সঙ্গে থাকার প্রস্তাব দিলেও সে প্রত্যাখান করে। তখন আবির তাকে কাউকে কিছু না বলার নির্দেশ দেয়।
ঘটনার দিন ১৫ নভেম্বর দুপুরে আবির ও তার এক বন্ধু রবিন ভাই ভাই হোটেলে যায়। আবির গরুর গোশত দিয়ে ভাত খায়। রবিন ভাত খায়নি, আবির ভাত খেয়ে চলে যায়। বিকেল ৫টার দিকে লোকজনের ছোটাছুটি দেখে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, আয়াতকে পাওয়া যাচ্ছে না। হোটেলে কাজ শেষে বের হওয়ার পর সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে আয়াতের বাসার বিপরীতে এক ভবনের নিচে আবিরের সঙ্গে তার দেখা হয়। দু’জন মিলে ওই এলাকার লেবার কলোনির দিকে আয়াতকে খুঁজতে বের হয়।
‘আমি আবির ভাইকে জিজ্ঞেস করি- আয়াত কোথায়, আপনি কি তাকে কিছু করেছেন? সে জানায়, আয়াতকে অপহরণের পর মেরে ফেলেছে, লাশ আকমল আলী রোডের পকেটগেট এলাকায় তার মায়ের বাসায় রেখেছে। ওই বাসায় মা এবং বোনের সঙ্গে সে থাকতো। আবির ভাই জানায়, দুই-একদিন পর আয়াতের দাদার কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করবে। টাকা নেওয়ার সময় আমি থাকলে আমাকেও কিছু টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। আমি রাজি হইনি। আয়াতকে মেরে ফেলার কথা শুনে ভয় পেয়ে বাসায় চলে যাই।’
জবানবন্দিতে হাসিব আরও জানায়, মানুষ সন্দেহ করবে- এই ভয়ে আয়াতকে মেরে ফেলার বিষয়টি জানার পরও সে কাউকে কিছু জানায়নি। এরপর থেকে গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত সে নিজের মতো করে স্বাভাবিক থাকে।
জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে ক্ষমা চেয়ে হাসিব বলে, ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমি সময়মতো আয়াতকে মেরে ফেলার ঘটনা সবাইকে বলে দিলে টুকরো টুকরো করার আগে লাশটা অন্তত পাওয়া যেত। কিন্তু আমি ভয়ে কাউকে কিছু বলিনি। পরে আমি শুনেছি- আবির আয়াতের লাশ টুকরো টুকরো করে ফেলে দিয়েছে।’
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিটের পুলিশ সুপার নাইমা সুলতানা বলেন, ‘নিজের কিংবা অন্য কারও সংঘটিত অপরাধ জেনেও গোপন করা আরেকটি গুরুতর অপরাধ। আবিরের ঘনিষ্ঠ ছেলেটিকে এই অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে। সে জানিয়েছে তার বয়স ১৭ বছর। কিন্তু তার জন্ম নিবন্ধন কিংবা বয়সের প্রমাণ হিসেবে কিছুই নেই। আমরা উপযুক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে তার বয়স নির্ধারণ করব। আপাতত তাকে অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে আদালতে সোপর্দ্দ করা হয়েছে। জবানবন্দি দেয়ার পর আদালত তাকে সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।’

