সিডিএ’র আউটার রিং রোড প্রকল্পের: একটি এলইডি বাতির দাম ২ লাখ ৭১ হাজার টাকা মাত্র!

বশির আলমামুন
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কতৃপক্ষ (সিডিএ) এর আউটার রিং রোড প্রকল্পের মূল প্রস্তাবে প্রতিটি এলইডি লাইটের পেছনে খরচ ধরা হয়েছিল ৪৮ হাজার ১৩১ টাকা। সেটিই এখন ‘সংশোধন’ করে ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭১ হাজার টাকা। লাইট প্রতি দাম বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ। একই কাজ করা হল বায়েজিদ বোস্তামী সড়ক প্রকল্পেও।
প্রায় ১০ বছর ধরে চট্টগ্রামে দুটি সড়ক নির্মাণের কাজ করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। সেই সড়ক দুটি নির্মাণের কাজ শেষ হচ্ছেই না। এবার সড়ক দুটিতে এলইডি লাইট বসানোর জন্য সিডিএ এমন এক দাম ধরে বসেছে, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে তোলপাড়। দেশের ইতিহাসেই এমন অস্বাভাবিক ও বেশি দামে এলইডি লাইট বসানোর প্রস্তাব আর আসেনি কোনো প্রকল্পে।
শুধু তাই নয়, মূল প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল প্রায় ১৭৩ কোটি টাকা, দফায় দফায় সংশোধন করতে করতে এখন সেই প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬০ কোটি টাকারও বেশি। অথচ ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ ছাড়াও বিভিন্ন খাতে অর্থ সাশ্রয় হয়েছে বলে উল্লেখ করা আছে সংশোধনী প্রস্তাবের বিবরণীতে। এরপরও কেন দ্বিগুণেরও বেশি ব্যয় বাড়বে— এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। অথচ ২০২০ সালেই ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের একটি প্রকল্পে প্রতিটি এলইডি লাইট কেনা ও স্থাপনে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৭৯ হাজার ৫০০ টাকা— যা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত দরের চেয়ে সাড়ে তিন গুণ কম।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) মূল প্রকল্পে প্রতিটি এলইডি লাইট কেনা ও স্থাপনে ব্যয় ধরা ছিল ৪৮ হাজার ১৩১ টাকা। সেই প্রস্তাবটিই এখন সংশোধন করে লাইটপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকারও বেশি। লাইটপ্রতি দাম বাড়ানো হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ।
দেশের ইতিহাসের এলইডি লাইট স্থাপনে এমন দর প্রস্তাব আর দেখা যায়নি অতীতে। প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ বেশি দর হাঁকিয়েও বিস্ময়করভাবে সিডিএর প্রস্তাবিত আউটার রিং রোড প্রকল্পে লাইটপ্রতি ২ লাখ ৭১ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব একনেকে অনুমোদিতও হয়ে গেছে। একই ধরনের অপর একটি প্রস্তাব এখন অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
সিডিএতে এলইডি লাইট নিয়ে বেশি টাকা বরাদ্দ নেওয়ার ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। ‘কনস্ট্রাকশন অব নর্থ-সাউথ রোড-১’ প্রকল্পে চট্টগ্রামের এই উন্নয়ন সংস্থাটি প্রতিটি এলইডি বাতি কেনা ও স্থাপনে ব্যয় করেছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার ৮২০ টাকা করে।
এর আগে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনও নগরীর সড়কে এলইডি লাইট লাগানো নিয়ে একই কাণ্ড করে অস্বাভাবিক খরচ দেখিয়েছে প্রতিটি এলইডি লাইটের পেছনে। ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ‘মডার্নাইজেশন অব সিটি স্ট্রিট লাইট সিস্টেম অ্যাট ডিফারেন্ট এরিয়াস আন্ডার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন’ প্রকল্পে প্রতিটি বাতি স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৬৫০ টাকা।
অথচ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তাদের ‘ডেভেলপমেন্ট অব ডিফারেন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচারস আন্ডার দ্য ঢাকা সাউথ সিটি করপোরেশন (সেকেন্ড রিভাইজড)’ প্রকল্পের অধীনে প্রতিটি এলইডি বাল্ব ক্রয় ও স্থাপনে ব্যয় ধরেছে মাত্র ৬৪ হাজার ৮৫৫ টাকা।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) যে দুটি প্রকল্পের জন্য অস্বাভাবিক এই বেশি দামে এলইডি লাইট কেনার প্রস্তাব করেছে, সেগুলো হচ্ছে চট্টগ্রাম আউটার রিং রোড নির্মাণ প্রকল্প এবং ঢাকা ট্রাংক রোড থেকে বায়েজিদ বোস্তামী রোড পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্প।
জানা গেছে, এই দুটি প্রকল্পের মূল মূল প্রস্তাবে ১৪৫টি স্ট্রিট লাইট (সড়কবাতি) কেনা ও স্থাপনে ৬৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও সংশোধিত নতুন প্রস্তাবে লাইটের সংখ্যা ধরা হয়েছে ২৪০টি। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
মূল প্রকল্পে প্রতিটি লাইট কেনা ও স্থাপনে ব্যয় ধরা ছিল ৪৮ হাজার ১৩১ টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে লাইটপ্রতি ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকারও বেশি। লাইটপ্রতি দাম বাড়ানো হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ।

মূল প্রকল্পে ১১৫টি বৈদ্যুতিক পোল অপসারণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে পোলের সংখ্যা না দেখিয়ে থোক বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
এদিকে শুধু ব্যয় বাড়ছে, কাজ শেষ হচ্ছে না এক দশকেও এমন অভিযোগ নিত্যদিনের।
২০১১ সালে শুরু করা চিটাগাং আউটার রিং রোড নির্মাণ প্রকল্পের কাজ গত এক দশকেও শেষ হয়নি। শুরুতে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮৫৬ কোটি টাকা। চার দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পর ২ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরে সম্প্রতি প্রকল্পটির সংশোধনী একনেকে অনুমোদিত হয়।
শেষ পর্যায়ে এসে প্রকল্পে নতুন করে যোগ হয় ১ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সিইপিজেড সড়ক। ওই সড়কে ৭০টি এলইডি বাতি স্থাপন করতে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা চেয়েছে সিডিএ। এতে প্রতিটি বাতিতে ব্যয় হবে প্রায় ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা করে।
মূল প্রকল্প প্রস্তাবে অন্যান্য সড়কে ২৮৩টি বাতি স্থাপনে ৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। সংশোধনীতে বাতির সংখ্যা ১১০-এ নামিয়ে এনে ২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা চেয়েছে সিডিএ। তাতে দেশের সবচেয়ে দামি এই এলইডি বাতির প্রতিটির দাম পড়ছে প্রায় ২ লাখ ৭১ হাজার টাকা। মূল প্রকল্পের চেয়ে সংশোধনীতে এলইডিপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। লাইট বসানোয় পাঁচ গুণ বেশি ব্যয় কেন বেড়ে গেল হঠাৎ— এমন কা-ের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে সিডিএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পাহাড়ি এলাকা বিবেচনায় রাস্তার দুই পাশে ২৫ মিটার দূরত্বে এলইডি লাইট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ায় ব্যয় বাড়ছে বলে সিডিএ সাফাই গাইছেন।।
সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামসও বলছেন, ‘পাহাড়ি সড়কের এলাকাটি নির্জন হওয়ায় ভালো মানের এলইডি লাইটের প্রস্তাব করায় ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। আমরা যে এলইডি বাতি স্থাপন করতে চাচ্ছি, সেগুলো জার্মানির তৈরি। এসব বাতি বেশি আলো দেয়, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচও কম।’
তবে এমন যুক্তি হাস্যকর ঠেকেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হকের কাছে। তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তির ক্রমাগত উন্নতির কারণে বিশ্বব্যাপী এলইডি বাতির দাম কমছে। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে উল্টো।’
অবকাঠামো বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক বলেন, ‘বেশি আলো পাওয়ার জন্য সড়কে শক্তিশালী বাতি ব্যবহার করার কথা কেউ বললে বুঝতে হবে তিনি ভুল বলছেন। কারণ সড়কে সব সময় পরিমিত আলো ব্যবহার করতে হয়। উচ্চমাত্রার আলো সড়কে দুর্ঘটনা বাড়াতে পারে।

আপনার ভালো লাগতে পারে এমন আরো কিছু খবর