মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সরাসরি নৌ-যোগাযোগ: বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা

​মোহাম্মদ ইমরান চৌধুরী
- Advertisement -
Single page 1st Paragraph

বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ভৌগোলিকভাবে একেবারে গায়ে গা ঘেঁষে থাকা দুই প্রতিবেশী। অথচ দুই দেশের সরাসরি কোনো উপকূলীয় নৌ-যোগাযোগ (Coastal Shipping) না থাকায় পণ্য আনা-নেওয়া করতে হয় সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা শ্রীলঙ্কার বন্দর ঘুরে। এতে একদিকে যেমন অস্বাভাবিক সময় নষ্ট হয়, অন্যদিকে হু হু করে বাড়ে পরিবহন ব্যয়।

​যদি দুই দেশের মধ্যে সরাসরি কোস্টাল শিপিং ব্যবস্থা পুরোদমে চালু হয়, তবে তা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বড় ধরনের গতি আনবে। এই পরিবর্তনের মূল প্রভাবগুলো সহজভাবে নিচে তুলে ধরা হলো:

​১. পরিবহন খরচ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে:

​ট্রানশিপমেন্টের বাড়তি ব্যয় বন্ধ:

বর্তমানে পণ্যবাহী কনটেইনার সরাসরি যাওয়ার বদলে তৃতীয় দেশের বন্দরে ওঠানামা করতে হয়। সরাসরি জাহাজ চললে এই বাড়তি হ্যান্ডলিং চার্জ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এতে প্রতি কনটেইনারে গড়ে ৩০০ থেকে ৬০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত খরচ বাঁচবে (সামগ্রিক ফ্রেইট চার্জ কমবে ৩০% থেকে ৫০%)।

​জ্বালানি সাশ্রয়:

চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন বন্দরের দূরত্ব মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০ নটিক্যাল মাইল। ঘুরতি পথ বাদ পড়ায় জাহাজের জ্বালানি খরচও এক ধাক্কায় অনেক কমে আসবে।

​২. সময় বাঁচবে প্রায় ৮০ শতাংশ:

​দ্রুত পণ্য খালাস:

ঘুরতি রুটে ট্রানজিটেই সময় লাগত ১৫ থেকে ২৫ দিন। সরাসরি কোস্টাল জাহাজ চালু হলে চট্টগ্রাম বা মোংলা থেকে ইয়াঙ্গুনে পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ২ থেকে ৪ দিন।

​মূলধন দ্রুত কাজে লাগানো:

পথেই দীর্ঘ সময় পণ্য আটকে না থাকায় আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের মূলধন দ্রুত ঘুরে আসবে (Working Capital Turnover বাড়বে), যা ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য বড় স্বস্তি।

​৩. বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়বে বহুগুণ:

​ওষুধের বিশাল বাজার ধরা সহজ হবে:

মিয়ানমারে বাংলাদেশি ওষুধের ভালো সুনাম ও চাহিদা রয়েছে। সরাসরি রেফ্রিজারেটেড (তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত) কনটেইনারে ওষুধ পাঠাতে পারলে মান অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং খরচ কম হওয়ায় থাইল্যান্ড বা ভারতের ওষুধের সাথে দামে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা যাবে।

​ভারী পণ্যের নতুন সুযোগ:

সিমেন্ট, রড, সিরামিক, পিভিসি পাইপ ও মেলামাইনের মতো ভারী পণ্য স্থলপথে ট্রাকে বা ঘুরতি রুটে জাহাজে পাঠানো বেশ ব্যয়বহুল। নৌপথে সস্তায় এসব পণ্য রপ্তানির বড় দুয়ার খুলে যাবে।

​পোশাক ও কাপড়:

মিয়ানমারের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর জন্য সুতা ও ফেব্রিক্স এবং স্থানীয় বাজারের জন্য সাধারণ পোশাক দ্রুত সরবরাহ করা যাবে।

​৪. জরুরি নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ও অপচয় রোধ:

​দ্রুত ঘাটতি পূরণ:

বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে নিয়মিত পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল ও সামুদ্রিক মাছ আমদানি করে। দেশে হঠাৎ কোনো পণ্যের সংকট তৈরি হলে ২–৩ দিনের মধ্যে সরাসরি জাহাজে বড় চালান এনে দেশের বাজার দ্রুত ঠান্ডা করা সম্ভব হবে।

​পচনশীল পণ্যের ক্ষতি রোধ:

আগে কাঠের ট্রলারে গাদাগাদি করে দীর্ঘ সময় নদী বা সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে প্রচুর কাঁচামাল পচে নষ্ট হতো। কনটেইনারে সরাসরি আনলে এই অপচয় প্রায় শূন্যে নেমে আসবে।

​৫. সীমান্ত সংঘাত ও রাখাইন সংকট এড়ানো:

​বর্তমানে দুই দেশের সিংহভাগ সীমান্ত বাণিজ্য হয় কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে। রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও গোলাগুলির কারণে এই বন্দর প্রায়ই মাসের পর মাস বন্ধ থাকে, ফলে পুরো বাণিজ্য থমকে যায়।
​সরাসরি কোস্টাল শিপিং চালু হলে বাণিজ্য সীমান্ত এলাকা এড়িয়ে সরাসরি চট্টগ্রাম/মোংলা বন্দর থেকে মিয়ানমারের মূল বাণিজ্যিক রাজধানী ইয়াঙ্গুনের সঙ্গে যুক্ত হবে। ফলে সীমান্তের যুদ্ধের আঁচ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর পড়বে না।

​৬. আসিয়ান (ASEAN) অঞ্চলের প্রবেশদ্বার:

​মিয়ানমার হলো দক্ষিণ এশিয়ার সাথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাকৃতিক সেতু। এই রুটে সরাসরি জাহাজ চলাচল সফল হলে ভবিষ্যতে থাইল্যান্ডের রেনং বন্দর এবং মালয়েশিয়ার বন্দরগুলোর সাথে যুক্ত হয়ে একটি আঞ্চলিক নৌ-করিডোর গড়ে তোলা সহজ হবে।

​সুফল পেতে যা দ্রুত করা দরকার:

​এই সুবিধার শতভাগ কাজে লাগাতে দুটি বড় বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি:

​লেনদেন জটিলতা সমাধান:

মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক কিছু আর্থিক বিধিনিষেধ থাকায় ব্যাংকিং চ্যানেলে এলসি (LC) সেটেলমেন্টে সমস্যা হয়। স্থানীয় মুদ্রা (টাকা ও কিয়াত) বিনিময়ের কার্যকর ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা প্রয়োজন।

​উপযুক্ত জাহাজ ও ডিজিটাল কাস্টমস:

অগভীর উপকূলে চলার উপযোগী মাঝারি মাপের কনটেইনার জাহাজের জোগান নিশ্চিত করা এবং বন্দরের ছাড়পত্র প্রক্রিয়া দ্রুত ও কাগজবিহীন (Paperless) করা।

​সরাসরি এই উপকূলীয় নৌপথ চালু হলে আগামী ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য খুব অনায়াসেই ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারে।

এই বিভাগের সব খবর

শিশুদের শৈশব হতে হবে নিরাপদ ও সুরক্ষিত : ডা. জুবাইদা রহমান

জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান বলেছেন,  শিশুদের শৈশব হতে হবে নিরাপদ। তাদের ভবিষ্যৎ হতে হবে সুরক্ষিত। তবেই নতুন উদ্যমে শিশুরা তাদের...

জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন, গেজেট প্রকাশ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ সংক্রান্ত মন্ত্রিসভায় গৃহীত অভিনন্দন প্রস্তাব গেজেট আকারে...

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল নার্সিং ইনস্টিটিউট ও নার্সিং কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার সমাপনী

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল নার্সিং ইনস্টিটিউট ও নার্সিং কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সমাপনী অনুষ্ঠান গতকাল সোমবার কার্যনির্বাহী কমিটির প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ...

সর্বশেষ

শিশুদের শৈশব হতে হবে নিরাপদ ও সুরক্ষিত : ডা. জুবাইদা রহমান

জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান বলেছেন,...

জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন, গেজেট প্রকাশ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ...

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল নার্সিং ইনস্টিটিউট ও নার্সিং কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার সমাপনী

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল নার্সিং ইনস্টিটিউট ও নার্সিং...

চীন, ভারত, জাপানসহ এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি এশিয়ার বড় বাজারগুলোতেও...

চট্টগ্রাম কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল পরিদর্শনে ব্যারিস্টার কামাল উল আলম

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল...

গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে দুর্গোৎসবকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ দেওয়া হবে না

শারদীয় দুর্গাপূজা কেন্দ্র করে গুজব, অপতথ্য, অপপ্রচার ও ছোট...