শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

ওষুধশিল্পের স্বাবলম্বিতা ও রফতানি বৃদ্ধি: সরকারের করণীয়

মোহাম্মদ ইমরান চৌধুরী
- Advertisement -
Single page 1st Paragraph

বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া কিংবা ২০১৬ সালে এফডিএ অনুমোদনের সুবাদে মার্কিন বাজারে প্রবেশ—বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের এই সক্ষমতা নিঃসন্দেহে বড় এক অনুপ্রেরণা। তবে এই অগ্রযাত্রার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিপজ্জনক কাঠামোগত দুর্বলতা, জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মূল উপাদান বা এপিআই (Active Pharmaceutical Ingredients) এবং উন্নত প্যাকেজিংয়ের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই এখনও চীন, ভারত বা ইউরোপ থেকে আমদানি করতে হয়। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী কড়াকড়ি, যার ফলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ট্রিপস চুক্তির অধীন পেটেন্ট ছাড়ের দীর্ঘদিনের রক্ষাকবচটি আর থাকবে না।
​ফর্মুলেশন খাতের এই প্রাথমিক সাফল্যকে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাসক্ষম শিল্পশক্তিতে রূপ দিতে হলে সরকারের নীতি-কৌশলে এখনই আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

​কাঁচামালের পরনির্ভরশীলতা কাটানো: এপিআই পার্কের স্থবিরতা দূরীকরণ

​কাঁচামাল আমদানির এই উচ্চ হারের অর্থ হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বা মুদ্রার বিনিময় হারে বড় ধরনের ওঠানামা হলেই আমাদের উৎপাদন খরচ ও রফতানির মার্জিন সরাসরি বিপদে পড়ে। তাই মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া এপিআই শিল্প পার্ককে নিছক অবকাঠামো প্রকল্প থেকে বের করে দ্রুত বাণিজ্যিক উৎপাদনে নিয়ে আসা এখন জাতীয় অর্থনীতির নিরাপত্তার প্রশ্ন। ​পার্কটিতে সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুতের সংস্থান শতভাগ নিশ্চিত করে বরাদ্দপ্রাপ্ত কোম্পানিগুলোকে উৎপাদনে যাওয়ার কঠোর সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে জটিল এপিআই ও এক্সিপিয়েন্ট তৈরিতে আগ্রহী দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তত ১০ থেকে ১৫ বছরের কর অবকাশ এবং প্রয়োজনীয় রাসায়নিক রি-এজেন্ট আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া দরকার। মৌলিক সিন্থেটিক কেমিক্যাল উৎপাদনে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের টানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল এ ক্ষেত্রে বড় অনুঘটক হতে পারে।

​এলডিসি উত্তরণ ও ট্রিপস-পরবর্তী আইনি ঢাল তৈরি:

​স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর অবাধে পেটেন্টেড জেনেরিক তৈরির সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসবে। তাই আসন্ন এই ধাক্কা সামলাতে এখনই আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ঢাল তৈরি করতে হবে।
​বিদ্যমান জাতীয় পেটেন্ট আইন এমনভাবে আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন, যেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধির ভেতরে থেকেই জনস্বার্থে ‘বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং’ (Compulsory Licensing) এবং প্যারালাল আমদানির সুযোগ অক্ষুণ্ণ থাকে। একই সাথে বহুজাতিক উদ্ভাবক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে দেশীয় শীর্ষ কোম্পানিগুলো যাতে ‘স্বেচ্ছামূলক লাইসেন্সিং’ (Voluntary Licensing) এবং যৌথ প্রযুক্তি বিনিময়ে যেতে পারে, সে জন্য সরকারকে কূটনৈতিক ও রাজস্ব প্রণোদনা দিতে হবে। এর বাইরে, যেসব উচ্চমূল্যের ওষুধের বিশ্বব্যাপী পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, সেই ‘জটিল অফ-পেটেন্ট জেনেরিক’ ফর্মুলেশনের দিকে উৎপাদনকারীদের দ্রুত সরিয়ে নিতে হবে।

​নিজস্ব সক্ষমতায় আন্তর্জাতিক টেস্টিং ও ডিজিডিএ-র রূপান্তর:

​যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের মতো শীর্ষ বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখার সবচেয়ে বড় কারিগরি বাধা হলো দেশে বিশ্বমানের টেস্টিং সুবিধার অনুপস্থিতি। উন্নত বিশ্বে ওষুধ নিবন্ধনের প্রধান শর্ত হলো ‘বায়ো-ইকুইভ্যালেন্স’ (BE) টেস্ট। দেশে আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃত ক্লিনিক্যাল ল্যাব না থাকায় আমাদের কোম্পানিগুলোকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে ভারত কিংবা সিঙ্গাপুরে গিয়ে এই পরীক্ষা করাতে হয়।
​সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) অবিলম্বে দেশে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি সেন্ট্রাল বায়ো-ইকুইভ্যালেন্স সেন্টার ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা জরুরি। এর পাশাপাশি ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে (ডিজিডিএ) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ম্যাচিউরিটি লেভেল ৪’-এ উন্নীত করা এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শন সহযোগিতা সংস্থা ‘PIC/S’-এর পূর্ণ সদস্যপদ অর্জনে দ্রুত কাজ করতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আন্তর্জাতিকভাবে প্রত্যয়িত না হলে দেশি ওষুধের ওপর বৈশ্বিক আস্থা কখনোই স্থায়ী হবে না।

​সাধারণ জেনেরিক থেকে বায়োসিমিলার ও উচ্চপ্রযুক্তির গবেষণায় উত্তরণ:

​বিশ্বের ফার্মা বাজার ক্রমেই সাধারণ ছোট অণুর (Small Molecule) কেমিক্যাল ড্রাগ থেকে সরে গিয়ে বায়োলোজিক্স, ইনসুলিন, অনকোলজি এবং মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডির দিকে ঝুঁকছে। ভবিষ্যৎ বাজারে টিকতে হলে বাংলাদেশকে এই বায়োসিমিলার বিপ্লবে অংশ নিতেই হবে।
​এ খাতে গতি আনতে কোম্পানিগুলোর গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) ব্যয়ের ওপর ২০০% পর্যন্ত সুপার ট্যাক্স ছাড়ের বিধান করা দরকার। এছাড়া বায়োটেক গবেষণায় বিশেষায়িত ‘ইনোভেশন ম্যাচিং ফান্ড’ চালু করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ফার্মেসি ও বায়োকেমিস্ট্রি অনুষদের সাথে ওষুধশিল্পের যৌথ গবেষণা বাধ্যতামূলক করা উচিত। এতে দেশেই দক্ষ বায়োটেক গবেষক ও প্রকৌশলী তৈরির স্থায়ী ভিত্তি গড়ে উঠবে।

​সক্রিয় বাণিজ্য কূটনীতি ও বিমানবন্দর কোল্ড-চেইন আধুনিকায়ন:

​পশ্চিমা দেশগুলোর পাশাপাশি আফ্রিকা, আসিয়ান এবং ল্যাটিন আমেরিকার উন্নয়নশীল বাজারগুলোতে বাংলাদেশি ওষুধের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এসব অঞ্চলে বাজারে দ্রুত প্রবেশের সুবিধার্থে আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর সাথে ওষুধ সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতি চুক্তি (Mutual Recognition Agreement) সই করা এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। প্রধান বাণিজ্যিক মিশনগুলোতে বিশেষায়িত ‘ফার্মা ডেস্ক’ চালু করে স্থানীয় নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় কোম্পানিগুলোকে সহায়তা দেওয়া দরকার।

​এর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে লজিস্টিকসে। বায়োলজিক্যাল ওষুধ, ইনসুলিন বা ভ্যাকসিন রফতানিতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলোতে আন্তর্জাতিকভাবে সনদপ্রাপ্ত (যেমন: IATA CEIV Pharma) সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় কোল্ড-স্টোরেজ ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অবকাঠামো গড়ে না তুললে উচ্চমূল্যের ওষুধ রফতানি বাড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

​বাংলাদেশের ওষুধশিল্প অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় পুরোটাই মিটিয়ে ইতোমধ্যে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে একে একটি আন্তর্জাতিক মানে রূপ দিতে হলে সস্তা শ্রমের সুবিধা ছেড়ে প্রযুক্তিগত স্বাবলম্বিতা, নীতিসহায়তা এবং নিজস্ব কাঁচামাল উৎপাদনের পথে দ্রুত হাঁটা ছাড়া ভিন্ন কোনো বিকল্প নেই।

এই বিভাগের সব খবর

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক তৃতীয় দেশের ওপর নির্ভরশীল নয় : ত্রিবেদী

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেছেন,...

প্রাণীর কল্যাণ নিশ্চিতে চসিক ও সিভাসু যৌথভাবে কাজ করবে : চসিক মেয়র

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, প্রাণীর কল্যাণ নিশ্চিতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু) যৌথভাবে...

বাঁশখালীতে টাকা আত্মসাতের সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তার

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে মালিকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ মালামাল ও নগদ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় রায়ের পর সাজা পরোয়ানাভুক্ত এক কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করেছে...

সর্বশেষ

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক তৃতীয় দেশের ওপর নির্ভরশীল নয় : ত্রিবেদী

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ঢাকার...

প্রাণীর কল্যাণ নিশ্চিতে চসিক ও সিভাসু যৌথভাবে কাজ করবে : চসিক মেয়র

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, প্রাণীর...

বাঁশখালীতে টাকা আত্মসাতের সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তার

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে মালিকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ মালামাল ও...

যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেবে না : ট্রাম্প

ইউরোপের কয়েকটি দেশ তাদের মজুত থেকে ডিজেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত...

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রাসায়নিকের ৯টি কন্টেইনার ধ্বংসের জন্য যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জে

দুই দশকের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ...

পটিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে মডেল হাসপাতালে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

দক্ষিণ চট্টগ্রামের বৃহত্তর এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পটিয়া...