অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরীতে বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসন ও জনদুর্ভোগ লাঘবে নতুন মডেলে কাজ শুরু হয়েছে। পতেঙ্গার দু’টি ওয়ার্ডে পাইলট প্রকল্প হিসেবে তার যাত্রা শুরু হলো। এর মাধ্যমে পানি সংকট কেটে যাবে।’
আজ (শুক্রবার) সকালে নগরীর হোটেল রেডিসন ব্লু’র একটি হলরুমে শহরের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে পানি-সরবরাহ সেবার মান বাড়াতে একটি নতুন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেল প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।
চুক্তির আওতায় ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে চট্টগ্রাম ওয়াসা। প্রতিষ্ঠান তিনটি একটি তিন বছর মেয়াদি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের ডেপুটি হেড অফ মিশন (বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান) ইয়ান ভ্যান ডার লিন্ডেনের উপস্থিতিতে সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের জনগণের পক্ষে ইসরাফিল খসরু ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের পানি সরবরাহের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন। চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. এটিএম তারিকুল ইসলাম এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়ামিন ফারুক নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমঝোতা স্মারকে সই করেন। নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের পানি ও জলবায়ু বিষয়ক প্রথম সচিব ইজে ক্রুজেন সমঝোতা স্মারকের সাক্ষী ছিলেন। নেদারল্যান্ডস দূতাবাস এই উদ্যোগে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণের দোরগোড়ায় পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ খাবার পানি পৌঁছে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। এর অংশ হিসেবে নগরীর প্রান্তিক পর্যায়ে উত্তর পতেঙ্গা ও দক্ষিণ পতেঙ্গায় একটি নতুন পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জনগণের সব মৌলিক চাহিদা পূরণের সরকার বদ্ধপরিকর, কিন্তু শুধু সরকার একা এটা করতে পারে না, এ জন্য পার্টনারশিপটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই মডেলে পানি সংকট নিরসনের চেষ্টা করছি আমরা। এই প্রকল্পে নেদারল্যান্ড দূতাবাস, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন, ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ এবং চট্টগ্রাম ওয়াসা একসাথে কাজ করবে।’
তিনি বলেন, ‘এখন অর্থনীতির সংজ্ঞাও বদলে গেছে। আগে সব সরকার করত। এখন সরকারের পক্ষে একা তো সবকিছু করা সম্ভব না। সরকারি সেবা সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমরা এই পার্টনারশিপটা সব জায়গায় অ্যাপ্লাই করছি। আমাদের পুরো অর্থনীতি মডেলে নতুন পদ্ধতি শুরু করেছি; আগে যেখানে ফাইন্যান্সিং শুধু লিমিটেড কিছু জায়গা থেকে হতো এখন তা আরও বিস্তৃত হচ্ছে। এখন আমরা লিমিটেড জায়গা থেকে সরে গিয়ে পিপিপি মডেলে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের দিকে যাচ্ছি। তার অর্থটা হচ্ছে, সরকার টাকা দেবে, প্রাইভেট সেক্টরও টাকা দেবে, এনজিওরা সহযোগিতা করবে। এই পার্টনারশিপের মাধ্যমে যে মডেল আমরা দাঁড় করাচ্ছি, সেটা দীর্ঘমেয়াদী হবে, সেটার উপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে। এবং এটার বেনিফিট পেতে মেইনটেনেন্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেখা যায় যে সরকার অনেককিছু করে, কিন্তু এগুলো আবার মেইনটেনেন্স করা হয় না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এইখানে কিন্তু পুরো প্যাকেজটা ওইভাবে করা হচ্ছে। আমরা ক্লিন ওয়াটারের সাথে সাথে বর্ষাকালে চট্টগ্রামের পানি নিষ্কাশনের সমস্যাটাও আমরা সিরিয়াসলি দেখছি। এটা নিয়েও নেদারল্যান্ড দূতাবাসের সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়েছে।’
চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মকর্তারা জানান, চুক্তির আওতায় তিনটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের জন্য একটি উদ্ভাবনী সরকারি-বেসরকারি পানি সরবরাহ মডেল অনুসন্ধান ও পরীক্ষা করবে, যার শুরু হবে কর্পোরেশনের ৪০ ও ৪১ ওয়ার্ডের চাহিদা নিরূপণ ও পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে। চট্টগ্রাম ওয়াসা, ম্যাক্স ফাউন্ডেশন এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের মধ্যে এটিই এ ধরনের প্রথম আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা, যেটি বাংলাদেশের পানি সরবরাহ খাতের জন্য একটি নতুন দিকনির্দেশনার সূচনা করেছে।
চলতি বছরের মে মাসে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এবং ম্যাক্স সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড (ম্যাক্স ট্যাপওয়াটার)-পরিচালিত একটি সমীক্ষার পর এই সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হলো।
ওই সমীক্ষায় দেখা যায়, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৪০ ও ৪১ ওয়ার্ডের ১ লাখ ৬৪ হাজার ৯৯ জন বাসিন্দার নিরাপদ খাবার পানি প্রাপ্তির সুযোগ সীমিত। ওই দুটি ওয়ার্ডের মাত্র ২০-৪০ শতাংশ বাড়িতে চট্টগ্রাম ওয়াসার পাইপলাইন নেটওয়ার্ক পৌঁছেছে।
সমীক্ষায় আরও দেখা যায়, দুটি ওয়ার্ডের অধিকাংশ বাসিন্দা বর্তমানে সেখানে কার্যক্রম পরিচালনকারী ৮৫-১১০টি বেসরকারি ভেন্ডরের কাছ থেকে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ লিটার করে পানি কেনেন, যার জন্য ব্যয় হয় ২৫ থেকে ৫০ টাকা করে। এতে আরও দেখা যায় যে, এলাকার ভূগর্ভস্থ পানি অত্যন্ত লবণাক্ত, পরীক্ষায় যার মাত্রা জাতীয় নিরাপদ সীমা ১ হাজার পিপিএম-এর বিপরীতে ৩ হাজার পিপিএম পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

